আমাদের কলেজ লাইফের দিনগুলাতে ক্যাটরিনা কাইফ মানেই ছিল এক উন্মাদনা। সুন্দরী,শুশ্রী, অসাধারন ফিগার আর নাচের ঝংকার তোলা সুন্দরী নায়িকা ক্যাটরিনা। সেইসব দিনে আমাদের রক্ত গরম করার এক মাদকতা ছিল ক্যাটরিনার মাঝে। এমনিতেই আমরা, এদেশের বা এশীয়া অঞ্চলের লোকেরা বিলাতী সব কিছুকেই অনবদ্য বা উপরের শ্রেনীর মনে করি, যেহেতু একসময়ে আমরা তাদের গোলাম ছিলাম! ক্যাটরিনা মুল ভারতীয় ছিলনা আর বিলেতি বিলেতি একটা ভাব ছিল তার চেহারায় তাই আমরা তার উপর ফিদা একটু বেশিই ছিলাম। দুস্টু হাসির আর চিকন ফিগার মিলিয়ে নাচের ছন্দে আমরা সবাই ক্যাটরিনা তে মুগ্ধ ছিলাম।
একসময়ে ভাবতাম প্রিয় সালমান খানই ক্যাটরিনাকে বিয়ে করবে। পুরো ভারতবর্ষের কোন পুরুষের বাহুলগ্না হিসেবে যদি ক্যাটরিনা কে মানায় তাইলে সেটা শুধুই সালমান (যদিও মনের কোনে উকি দিত, ইস যদি...)। আমাদের খুব প্রিয় হুমায়ুন কবির স্যার আমাদের কে Probability পড়াতে গিয়ে উদাহরণ স্বরুপ বলেছিলেন, ধর, নায়িকা ক্যাটরিনা অবিবাহিত আর তুই ও সেইম, তাইলে ক্যাটরিনার সাথে বিয়ে হবার একটা চান্স কিন্তু তরও আছে। সেটা অতি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র হলেও একটা ক্ষীন সম্ভাবনা বিদ্যমান। আর এই যে ক্ষুদ্র সম্ভাবনা এটাই হচ্ছে Probability.সেই দিন স্যার থেকে সংজ্ঞা শুনে কিন্তু মনে মনে খুশিই হয়েছিলাম, আহা, প্রোবাবেলিটি!!! এখন পর্যন্ত সালমান বা ক্যাটরিনা কেহই বিয়ে করেনি। কিন্তু আমরা বিয়ে করে বাচ্চাকাচ্চার বাবা মা হয়ে এখন বুড়ো হবার অপেক্ষায় আছি আর ভাবছি কবে নানা নানি হবো? কিন্তু সালমান আর ক্যাটরিনা কিন্তু এখনো অবিবাহিত! এখনো এলিজেবল!!!
আমাদের দেশের গনতন্ত্রকেও আমার কাছে ক্যাটরিনা কাইফ মনে হয়। প্রধান দুই দল আওয়ামিলীগ আর বিএনপি গনতন্ত্র নামক ক্যাটরিনাকে নিজেদের পছন্দ মতো চেহারায় সাজায়। যেমনটা সিনেমার পরিচালক সাজায় তার প্লট অনুযায়ী নায়িকাকে! সরকারি দল গনতন্ত্রকে মনে করে খুল্লামখুল্লা ক্যাটরিনা কাইফ, যে মিনি স্কার্ট, টপস বা ফেন্সি ড্রেস পরে সবাইকে মাতিয়ে রাখবে সারাক্ষন। যদি জনগন ঝিমিয়ে পড়ে তাইলে বিকিনী বা সুইমস্যুট পরাবে আর উত্তেজনার পারদ বাড়াবে বহুগুনে। সারাক্ষনই এই ক্যাটরিনা জনগনকে আমোদিত করবে। এই ক্যাটরিনা যে রক্তমাংসের মানুষ এটা প্রায় ভুলেই গেছে তারা। স্বাভাবিক চলনবলন এ তার যে একটা স্বাভাবিক জীবনধারা আছে এই বোধ আমাদের দরকারি দলের লোকেদের একটু কম বলেই আমার মনে হয়। যদিও আমি আওয়ামিলীগ পরিবারের লোক, সমর্থক কিন্তু তাই বলে অন্ধভাবে সমর্থন করাটাকে আমি ব্যক্তিগত ভাবে পছন্দ করিনা। আমার দলের ভুলত্রুটি আমাকেই শুধরাতে হবে নিদেনপক্ষে ভুলের বিপক্ষে আওয়াজ তুলতে হবে।সেটা যতটা সাধারন জনগনের স্বার্থে ঠিক ততটাই দলের স্বার্থে। দলের ভীত মজবুত রাখতে হলে দলের ভুলত্রুটি শুধরে নিতে না পারলে একসময়ে দলের আর জনগনেরই বড় ক্ষতি সাধিত হবে।
আমাদের প্রধান বিরোধীদল(সত্যিকারের) বিএনপির কাছে গনতন্ত্রটা অনেকটা সদ্য স্বামী হারানো বিধবা ক্যাটরিনার মতো।যে সারাক্ষন একটা দু:খের ছায়া মাথায় করে সাদা কাপড়ে নিজেকে জড়িয়ে রাখবে চোখে জল ছলছল নিয়ে। ক্ষমতায় যাবার জন্য জামাত নামক বিষফোঁড়া সাথে নিয়ে তারা এখন সারাক্ষন হাসফাস করে বেড়াচ্ছে। আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশীয় অঞ্চলে গনতন্ত্র বা রাজনীতি মানেই যে আন্দোলন সংগ্রাম, জেল জুলুম সে ভাবনা বিএনপির সিনিয়র নেতৃত্ব মনে হয় ভুলেই গেছে! তাদের ভাবখানা অনেকটা আম-কাঠাল ভাংগার পরের মাছির মতো। তারা শুধু মাত্র আম-কাঠাল এর গন্ধেই মাতোয়ারা। ক্ষমতার স্বাদ নেবার সময় হলেই কেবল তাদের হাটে ঘাটে মাঠে বিচরন করতে দেখা যায়। ভাড়াকরা লোকবল দিয়ে আন্দোলন সংগ্রাম চালিয়ে নিজেরা এসির হাওয়ায় থাকতে থাকতে এখন গায়ের চর্বি এতটাই বাড়িয়েছে যে জনগনকে সম্পৃক্ত করে কোন যুগপত আন্দোলন করা তাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছেনা। নিজেদের মাঝের অন্তরকোন্দল আর জনসম্পৃক্ততা হারিয়ে তাদের অবস্থা আজ বেহাল। অনেক সময়ে তাদের ভাবখানা এমন যেন সরকারি দলের দায়িত্ব ভোটের বাজারে ওনাদের জিতিয়ে দেয়া বা তিনাদের ক্ষমতায় এনে দেয়া আওয়ামিলীগ সরকারের দায়িত্ব, শুধু দায়িত্ব না, পবিত্র দায়িত্ব!! ভোট চুরি বা ম্যাকানিজম, অসম আন্দোলন, ইসির বিতর্কিত ভুমিকা সব কিছুতেই বিএনপি নেতাদের গাছাড়া ভাব আর অন্যের উপর আন্দোলন নির্ভরতা তাদের কে অকেজো করে দিয়েছে। এখন সুযোগ পেয়ে সরকারি দল ইচ্ছেমত গনতন্ত্র চর্চা করছে আর বিএনপি শুধুমাত্র মিডিয়া নির্ভর হাকডাক দিয়ে চুপসে যাচ্ছে! অধিকার যে কেহ কাউকে দেয়না, নিজের অধিকার যে আদায় করতে হয় সে ভাবনা তাদের কারো মাঝেই নাই।
আমরা এগিয়ে যাচ্ছি।দেশ উন্নত হচ্ছে। লোকেদের অভাব দূর হচ্ছে। অর্থনীতি এগোচ্ছে,জনগনের জীবনযাত্রার মান এগোচ্ছে। পদ্মা সেতু হচ্ছে,অবকাঠামোগত উন্নয়ন হচ্ছে, সবই এগুচ্ছে শুধু পেছাচ্ছে আমাদের গনতন্ত্র! আমরা স্বাধীন গনতন্ত্র পাচ্ছিনা। দুইদল নিজেদের মতো করে গনতন্ত্রের সংজ্ঞা দিচ্ছে। ভুলভাল বুঝাচ্ছে, জনগনকে এখনও বেকুব মনে করে নিজেদের ইচ্ছেমত গনতন্ত্রের চর্চা করছে কিন্তু তাদের এই চিন্তা চেতনা জাগ্রত হচ্ছেনা যে মানুষ শিক্ষিত হচ্ছে, ফেজবুক তথা ইলেকট্রনিক মিডিয়ার কল্যানে যেকোন খবর সেটা ভাল কিংবা খারাপ,খুব সহজেই সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা বাঙ্গালীর কাছে পৌচ্ছে যাচ্ছে। এখন আর আপামর জনগনকে যা ইচ্ছে বোঝানো যাচ্ছেনা বা ভুলভাল বুঝাতে গেলে যে জনগন তা ধরে ফেলছে সে বোধ এখনো আমাদের নেতাদের মাঝে জাগ্রত হচ্ছেনা।
নেতাদের বোঝা উচিত, নদীর তীর ব্যপকহারে ভাংগার আগে প্রথমে সুক্ষ ফাটল দেখা দেয়, সেই ফাটল ধীরে ধীরে বড় হয় আর একসময় ব্যাপকহারে ভেংগে গিয়ে নদীর চেহারা আমুল বদলে যায়। আমাদের নেতাদের বুঝা উচিত নদীর সুক্ষ ফাটলের মতো জনগনের মাঝে ভালমন্দ বুঝার ক্ষমতা উদয় হয়েছে। নিজের আর দেশের ভালর কথা ভাবা শুরু হয়ে গেছে। আমাদের মোট ভোটারের প্রায় ৩৫/৪০% ই বয়স ৩৫ এর মধ্যে,যারা অনেকটাই সচেতন,নিজের আর দেশের প্রশ্নে। জনগন এখন সচেতন হওয়া শুরু করেছে। দুর্দান্ড প্রতাপের নেতারা এখন একঘরে হয়ে যাচ্ছে, নেগেটিভ ইমেজের নেতারা অসহায় হয়ে পড়ছে,তাদের পিছনে এখন আর কেউ আগের মতো ভীর করছেনা!দিনবদলের শুরু হয়ে গেছে অলরেডি! এখন আর কেউ ৮ হাজার টাকায় বালিশ কিনে ধরাছোওয়ার বাইরে থাকছেনা। দুর্নিতি অনিয়মের মাধ্যমে আর্জিত টাকা এখন আর নিজেরা সামলাতে পারছেনা।
ক্যাটরিনার বুঝা উচিত,তার বয়স হচ্ছে, এখন আর তার আবেদন আগের মতো নাই।এখন আর তাকে দেখলেই রক্ত গরম হয়না, এখন আর তার দেহ ভংগী দেখলেই সবার মাঝে নৃত্যনকুন্দন শুরু হয়না। তার বয়স হচ্ছে,তার আবেদন কমে যাচ্ছে। গনতন্ত্র ও মোহনীয়,পুজনীয় সবার কাছে।মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সবাই চায়। কিন্তু গনতন্ত্রও যদি সঠিক পথে না থাকে, জনগনও যদি গনতন্ত্রের চর্চা নিজেদের মত করতে না পারে তাইলে একদিন আমাদের গনতন্ত্রও ক্যাটরিনার মতো বুড়ি হয়ে যাবে, আবেদন হারাবে! কেউ আর গনতন্ত্র চাইবেনা। সৌদী বা চীনের মত অবস্থা হয়ে যাবে, উন্নত জীবনযাপন পেয়ে গেলে কেউ আর গনতন্ত্রের জন্য অপেক্ষায় থাকবেনা। যে সকল নেতারা এতদিন গনতন্ত্রের ধোয়া দিয়ে জনগনকে মায়াজালে আটকিয়ে রেখেছিল তারা একদিন আবিস্কার করবে,
ক্যাটরিনা ঠিকই ছোট হাফপ্যান্ট পড়ে নাচছে
কিন্তু দেখার জন্য কেউ ভীর করছেনা!!!
তখন আমাদের নেতাদের মাঝে শুধু একটাই আফসোস থাকবে, আর সারাক্ষন একটাই কথা আওড়াতে থাকবে,
আহা ক্যাটরিনা, আহা গনতন্ত্র!!!
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন