সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

আমি যদি কাক হতাম

              ২২ মেআর সকল দিনের মতোই ছিল সবার জন্যশুধু আমার আর আহিয়ানের জন্য কিছুটা ব্যতিক্রম ছিলগতকাল ছিল তার (প্রয়াত বউয়ের) চলে যাবার ১ম বার্ষিকী২০২০ সালের ২২ মে, জুম্মাতুল বিদার দিনে বিকেল ৩.১৫ মিনিটের সময় সে চলে গেছে আমাদের ছেড়ে, ছোট্ট বাবুটাকে সাথে নিয়েএই এক বছরে অনেক কিছু বদলেছে,    সাথে বদলেছি আমি আর নিজেকে বদলে নিয়েছে আহিয়ানগতকাল দিনটাকে আর দশটা দিনের মতোই স্বাভাবিকভাবে কাটানোর চেস্টা করেছিকতকটা পেরেছি আবার কতকটা পারিনিশুধু একবার আফসোস করে ভেবেছি,

"আমি যদি কাক হতাম!"

 

নজরুল আমার প্রিয় কবিছোটবেলা থেকেইদু:খ কস্টে, দারিদ্রে, শ্রমে ঘামে, আত্মমর্যাদায়, অভিমানে বেচে থাকা নজরুল আমার খুব প্রিয়,খুবই শ্রদ্ধারনজরুলের একটা গান/গজল ছোট বেলা থেকে খুব পছন্দ করতাম, গুনগুন করে গাইতামসেটা ছিল-

আমি যদি আরব হতাম,

মদিনার ও পথ

সেই পথেতে হেটে যেতেননুর নবী হযরত (স)

কাল মনে হচ্ছিল,আমি যদি কাক হতাম!

 

         কাক এমন একটা পাখি, যাকে খুব কম মানুষ পছন্দ করেবছরখানেক আগেও আমি অপছন্দ করতামযেমনটা সবাই করেকিন্তু পাখি কিংবা প্রানীকুলে কাক একমাত্র পাখি যে তার সংগী হারানোর পর আর নতুন সংগী খুজেনাজীবিতাবস্থায় আর সংসার করেনাবাকী জীবনে কাক একাকি থাকে, তার প্রিয়জনের স্মৃতী সাথে নিয়েআমি পারিনি একটা কাক হতে!

 

      আমি আর আমার বউ (প্রয়াত), খুব খুনসুটিতে মেতে থাকতাম, সারাক্ষনআমি বা সে, আমাদের কেউ অসুস্থ হলেই আমরা একে অপরকে জিজ্ঞেস করতাম, আমার কিছু হলে তুমি আবার কি বিয়ে করবে? সেও প্রশ্নটা আমকে করতোসে খুবই টেনশান করতো, সামান্য জ্বর হলেই উল্টাপাল্টা বকা শুরু করতোআমাকে প্রশ্ন করতো,আপনি কি আবার বিয়ে করবেন? আমি মারা গেলে? আমি বলতাম, ৪১ দিন পর্যন্ত করবোনা৪২তম দিনে করে নিবো! সে শুনে অনেক অভিমান করতোআমি বুঝতাম,তার রাগ হচ্ছে, নাক লাল হয়ে যাচ্ছে, অভিমান বেড়ে যাচ্ছে! প্রতিবারেই আমি তাকে একটা গল্প শুনাতাম,

এক লোকের বউ মৃত্যুপ্রহর গুনছেমারা যাবার আগে, বউ তার স্বামীকে বলে গেছে, যেদিন আমার কবরে ধুলা উড়বে, সেদিন আপনি আবার বিয়ে করে নিয়েন! বউ মারা যাবার পরে লোকটা প্রায় দিন একটা হাতপাখা নিয়ে বিকেল বেলায় বউয়ের কবরে বাতাস করে! সবাই দেখে বলাবলি করে, আহারে কি মানুষ, মরা বউয়ের কবরেও হাত পাখা দিয়ে বাতাস করতাছে, কি মহব্বত!! লোকটা কিন্তু হাতপাখা দিয়ে বাতাস করে আর অপেক্ষা করে,কবে ধুলা উড়বে কবর থেকে?

 

             দিন যায়,মাস যায়, বছর ও পেরোয়কবরে আর ধুলি উড়েনালোকটা অবশেষে আশা ছেড়ে দেয়, তার খায়াল বউয়ের কবরে আর কখনোই ধুলি উড়বেনা! হয়তো উপরওয়ালা চায়না আমি আবার বিয়ে করি!

আসল ঘটনা ছিল, তার বউ মরে যাবার আগে তার ছোট ভাইকে, যে খুবই পরহেজগার ছিল,তাকে বলে গেছে, ভাই আমি মরে গেলে তুই প্রতিদিন ফজরের নামাজ পড়ে আমার কবরে এক কলস পানি দিবি, যাতে আমার কবরটা ঠান্ডা থাকেআমি তাইলে কবরের ভেতর থেকেও শান্তি পাবো!!

 

        আমি বিয়ে করেছি জেনে অনেকেই ভ্রু কুচকে তাকিয়েছেঅনেকেই ইশারায় ইংগিতে এটা সেটা বুঝাতে চেয়েছে, আমি সবার ইশারাই বুঝেছিআবার অনেকেই বিয়ে করার জন্য বলেছেনআমি বুঝেছি দুই দলের সবাই কেকিন্তু সত্যিকার অর্থে আমি বুঝতে চেয়েছি আমার ছেলেকে, আহিয়ান কি চায়? একটা মানুষ তার শারিরীক চাহিদা পশুর সাথেও মেটাতে পারে কিন্তু কিছু চাদিহা পুরন করা যায়নাশুধু একটা স্নেহের হাতের পরশ পারে সেই চাহিদা পুরন করতেআহিয়ান যেদিন থেকে মায়ের অভাব আমাকে জানিয়েছে,সেদিন থেকেই আমি খুজেছি আহিয়ানের একটা মাকারন আমি আমার একটা বউ পাবো যেকোন সময়ে, আজ,কাল বা কিছু বছর পর অথবা প্রয়াত বউয়ের স্মৃতিই আমার বেচে থাকার সম্বল হিসেবে যথেস্ট কিন্তু আহয়ান তার মা পাবেকি? আহিয়ান কি পারবে মা ছাড়া বড় হতে? যেখানে আমিও এতিম, বাবা মা হারা! আল্লাহর কাছে চেয়েছি আহিয়ান যেন একটা মা পায়, এখন অপেক্ষা সময়েরযেন সে আহিয়ানের মা হয়ে উঠতে পারে

 

       মাঝে মাঝে একটা ব্যাপার ভাবি, একটা কাক, সংগি হারানোর পর হয়ত একাকি একটা বাচ্চা পেলে পোষে বড় করে ফেলে, অথবা বাচ্চাটা যেকোন ভাবে বড় হয়ে যায়কিন্তু কাকের বাচ্চা আর মানুষের বাচ্চা কি এক? মানুষের বাচ্চা কেন কাকের বাচ্চা হয়না?

আর আফসোস করি,

আমি যদি কাক হতাম?

 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

A perfect weekend

আব্বা বলতেন ,  A perfect holiday starts with gardening, continues with prayer and ends with a deep sleep.  আমার ছোট বেলায় আব্বা যখন  Narinda Govt. High School   এর শিক্ষক , তখন শুধুমাত্র শুক্রবার ছুটি পেতেন  আর আমি আব্বাকে সপ্তাহে ওই একদিন কাছে পেতাম । পুরো সপ্তাহ আমি আব্বার এই একটা দিনের জন্য অপেক্ষায় থাকতাম । যদিও আব্বা বৃহ:স্পতিবারে আসতেন ঢাকা থেকে বিকেলের মধ্যে । আমাদের স্কুল হাফ থাকত তাই স্কুল থেকে বাড়িতে এসেই আব্বার অপেক্ষা । শুক্রবার সকালে আব্বা নিয়ে যেতেন দাদা-দাদির কবর জিয়ারতে । সেখান থেকে বাড়িতে এসে বাগান বাড়িতে শাকসবজি আর ফল ফুলের গাছের পরিচর্যা করতাম । এই পরিচর্যার ফাকে আম্মা চা বিস্কিট আর শরবত খাওয়াতেন । দুপুরে একসাথে পুকুরে গোসল করে জুম্মার নামাজ শেষে একসাথে খেয়ে আব্বাকে জড়িয়ে ধরে ঘুম । আহা সেকি ঘুম বাবার বুকের মাঝে!! বিকেলে খেলাধুলা করে এসে সন্ধায় আব্বার সামনে পড়তে বসা । অন্য সবাই আব্বার সামনে পড়তে বসতে ভয় পেত কিন্তু আমি আব্বার কাছে পড়তাম । খুব মেজাজি ছিলেন কিন্তু আমার জন্য আব্বার আলাদা একটা টান ছিল সবসময় । সেটা আম্মা মারা যাবার পর খুব বেশি উপলব...

আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে:

মঙ্গলকাব্যের এই একটা উপাধ্যায় আমার মনে খুব রেখাপাত করেছে । আমার সন্তান যেন থাকে দুধেভাতে! প্রত্যেকটা পিতামাতার কাছেই তার সন্তান তার পরম সাধনার ধন । পিতার স্বপ্নের ফল ও ফসল । একজন পিতা কাদামাটিতে যে বীজ বুনে যায় , একজন সন্তান সেই বীজ থেকে চারা গজিয়ে দিনে দিনে তাকে মহীরুহ করে গড়ে তুলে । পিতা বেচে থাকেন আর না থাকেন , সন্তান তার পিতার স্বপ্নের জালে পালতুলে নতুন স্বপ্নের বীজ বুনে যায় পরবর্তি সন্তানের জন্যে । আর এভাবেই যুগযুগ ধরে স্বপ্নেরা বেচে থাকে , ভুমিতলে । পৃথিবীর আবাদি এভাবেই বেড়ে চলে!                    আমি আজন্ম ঘুমকাতুরে লোক । সেই ছোটবেলা থেকে সংসার জীবনের আগ পর্যন্ত আমার ঘুমের এমন অবস্থা ছিল যে একবার ঘুমিয়ে যাবার পর আমার সামনে কেহ ঢোল পিটালেও আমার ঘুমের কোন গত্যান্তর হতোনা । আমি ঘুমের কোলেই থাকতাম । আবার এমনও ছিল , নিজে থেকে জেগে উঠার আগে কেহ আমাকে ঘুম থেকে জাগালেই আমার মাথা ব্যাথা হতো খুব । একারনে সাধারনত কেহ মানে পরিচিতজনদের মাঝে কেহ আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলতোনা । আমি আমার মত করে ...