সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

আমি যেন বাবা হয়ে গেছি:

          ছোট বেলা থেকেই আমি আম্মার পিছু পিছু থাকতামবলা যায় আম্মার আচল ধরে সারাদিনঅনেক বড় হবার পরেও আম্মার সাথেই ঘুমাতামআম্মা যেদিন বলেছিলেন,আজ থেকে তুই আলাদা থাকবি, সেদিন আম্মার খাটের পাশে মাটিতে পাটি বিছিয়ে ঘুমিয়েছিকিন্তু থেকেছি আম্মার আশেপাশেইআব্বাকে ছোট বেলায় পেতাম সপ্তাহে মাত্র একদিনশুক্রবারআব্বা ঢাকা থেকে বৃহস্পতিবার বিকেলে আসতেন আর শনিবার খুব ভোর বেলায় চলে যেতেনআমি যতটা আম্মার পিছু পিছু ঘুরতাম,আব্বাও তেমনি বাড়ি এসেই আমার পিছুপিছু ঘুরতেনবলা যায় বাড়িতে থাকা পুরো সময়টা আমাকে কাছে রাখতেনআমি যতই পালিয়ে থাকতে চাইতাম,আব্বা ততই আমাকে কাছে ডেকে রাখতেনমনে আছে,মাঝে মাঝে খুব রাগ লাগতকিন্তু মুখ ফুটে বলার সাহস হয়নি কখনো

 

আম্মা মারা যাবার পর, সেই ২০০৭ সাল থেকে আব্বাকে বুঝতে শুরু করিসেটা ঠিক আম্মার অভাব পুরন করার জন্যে বলা চলেআমি তখন অনার্স এ পড়িবাড়ি গেলেই আম্মার স্মৃতি আমাকে পেয়ে বসতো তাই আব্বার কাছে ঘেষা শুরু করিআব্বাও তখন আমাকে আরও বেশি করে কাছে রাখতে চাইতেনঅনেক রাত অবধি আব্বার সাথে আড্ডা হতআব্বা তার ছোট বেলার কথা, চাকুরি জীবিনের ঘাত সংঘাত, সাংসারিক জীবন, আম্মার আগলেরাখা সংসার সব খুটে খুটে বলতেনএক সময়ে হিসেব করে দেখলাম আব্বা কতটুকুন করেছেন আমার জন্যে!

 

        সেই ছোট বেলাতে আব্বা আমাকে কাধে নিয়ে পুরো এলাকা ঘুরতেন, মাঠে যেতেন, পুকুরে গোসল করাতেনশর্দি হলে নাক মুছে দিতেনকোথাও কোন মিটিং এ গেলেও আমাকে সাথে করে নিয়ে যেতেনআব্বার জ্বর হলে খুব হইচই করতেনএকেবারে বাচ্চা ছেলেদের মতোসেই সময়ে আব্বা শুধু আমাকে কাছে ডাকতেনবলতেন, কপালে একটু হাত রাখতো বাবামনে পড়ে ব্যাংক এ চাকুরি করা কালীন,আমি তখন ঢাকায় থাকিআব্বার একবার জ্বর হয়েছিলো খুবআব্বা ফোনে আমাকে বলেছিলেন তুই ছুটি নিয়ে চলে আয়! আমার খুব জ্বর হইছেআমি অবাক, যেখানে আব্বা সবাইকে বলতেন, অফিস চলাকালীন যেন কেউ আমাকে ফোন করে বিরক্ত না করেব্যাংকারের চাকুরি খুবই সংবেদনশীল, সেখানে আব্বা বলছেন,তুই ছুটি নিয়ে চলে আয়, আমার খুব জ্বর হয়েছে!

 

        আব্বা মারা যান ২০১৬ সালেআব্বা মারা যাবার পর থেকে একটা অপরাধবোধ কাজ করতে শুরু করে আমার মাঝে! আব্বা আমাকে যতটা ভালবেসেছেন তার সিকিভাগ ও আমি আব্বাকে ফিল করিনি! আব্বাকে বুঝার চেস্টা ঠিক অতটা করিনি যতটা করা দরকার ছিল!

        ২০২০ সালের ২২ মে, বউ(প্রয়াত) চলে যাবার দিন দুপুর বেলা হাসপাতালে কথা হচ্ছিল আমাদের দুইজনেরসে জিজ্ঞাসা করেছিলো, সেইভ করবো কবে? উত্তরে আমি শুধু হেসেছিলাম! সে একটু রেগে গিয়েছিল, বলেছিল ঈদের দিন কিন্তু আপনাকে সেইভ করতেই হবে! আমি হা বা না কিছুই বলিনিচুপমেরে ছিলামবলেছিলাম, দেখি!

 

        ২০২০ এর ২৬ শে মার্চ থেকে লকডাউন শুরু হয়ে ব্যাংক বন্ধ হয়ে গিয়েছিল আর সেই থেকে সেইভ করা ছেড়ে দিয়েছিলামবউ যদিও খোঁচা খোঁচা দাড়িগোঁফ খুবই অপছন্দ করতো কিন্তু সেই সময়টাতে কিছুই বলেনি ব্যাংক বন্ধ ছিল বলে

আমার গোঁফদাড়ি একটু বড় হওয়াতে একদিন আয়নায় দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখে মনে হয়েছিলো, যেন আমি আব্বাকে দেখছি! ধ্বুক করে বুকটা কেপে উঠেছিল! আব্বাকি ফিরে এলেন আমার মাঝে?

 

       আমাদের প্ল্যান ছিল ২০২৩ সালে একসাথে হজ্ব করবোআর হজ্ব করেই দাড়ি রাখবো ভেবেছিলাম, বউও তাতে রাজি হয়েছিলআম্মা হজ্ব করতে পারেন নিবউকে (প্রয়াত) বলেছিলাম, আমি জীবনে দুইবার হজ্ব করবো,একবার আমার নিজের আরেকবার আম্মার বদলি হজ্ব! সেই মত প্ল্যান করেছিলাম, ২০২৩ সালে আমরা হজ্বে যাবো আর তারপরে সময় সুযোগ করে আম্মার বদলী হজ্ব করা যাবে

 

       এখন দাড়িগোঁফ রেখে মাঝে মাঝে নিজেকে আয়নায় দেখি,অনেক সময় নিয়ে মাঝ রাতেযখন বউ বাচ্চা ঘুমিয়ে যায় তখনমনে হয় আব্বাকে যেন দেখছিআব্বা আমার চেয়ে বেশ ফর্সা ছিলেনআমার ১০ ভাইবোনের মাঝে আমাকে ছাড়া বাকি ৯ জনই আব্বার মতো ফর্সা হয়েছে দেখতে শুধু আমি হয়েছি আম্মার মতো, শ্যামলা

 

করোনাকাল অনেক কিছু নিয়ে গেছে আমার জীবন থেকেআমুল বদলে দিয়ে গেছে জীবনের সব হিসেব নিকাসশুধু একটা বড় পাওয়া হয়েছে আমার করোনাকালে

দাড়িগোফ রেখে দিয়ে এখন আমি যেন আয়নাতে আব্বাকে দেখি!

আমি যেন আব্বাতে ফিরে গেছি!

রাব্বিরহামহুমা কামা রাব্বা ইয়ানিছ সাগিরা.

 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে:

মঙ্গলকাব্যের এই একটা উপাধ্যায় আমার মনে খুব রেখাপাত করেছে । আমার সন্তান যেন থাকে দুধেভাতে! প্রত্যেকটা পিতামাতার কাছেই তার সন্তান তার পরম সাধনার ধন । পিতার স্বপ্নের ফল ও ফসল । একজন পিতা কাদামাটিতে যে বীজ বুনে যায় , একজন সন্তান সেই বীজ থেকে চারা গজিয়ে দিনে দিনে তাকে মহীরুহ করে গড়ে তুলে । পিতা বেচে থাকেন আর না থাকেন , সন্তান তার পিতার স্বপ্নের জালে পালতুলে নতুন স্বপ্নের বীজ বুনে যায় পরবর্তি সন্তানের জন্যে । আর এভাবেই যুগযুগ ধরে স্বপ্নেরা বেচে থাকে , ভুমিতলে । পৃথিবীর আবাদি এভাবেই বেড়ে চলে!                    আমি আজন্ম ঘুমকাতুরে লোক । সেই ছোটবেলা থেকে সংসার জীবনের আগ পর্যন্ত আমার ঘুমের এমন অবস্থা ছিল যে একবার ঘুমিয়ে যাবার পর আমার সামনে কেহ ঢোল পিটালেও আমার ঘুমের কোন গত্যান্তর হতোনা । আমি ঘুমের কোলেই থাকতাম । আবার এমনও ছিল , নিজে থেকে জেগে উঠার আগে কেহ আমাকে ঘুম থেকে জাগালেই আমার মাথা ব্যাথা হতো খুব । একারনে সাধারনত কেহ মানে পরিচিতজনদের মাঝে কেহ আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলতোনা । আমি আমার মত করে ...

A perfect weekend

আব্বা বলতেন ,  A perfect holiday starts with gardening, continues with prayer and ends with a deep sleep.  আমার ছোট বেলায় আব্বা যখন  Narinda Govt. High School   এর শিক্ষক , তখন শুধুমাত্র শুক্রবার ছুটি পেতেন  আর আমি আব্বাকে সপ্তাহে ওই একদিন কাছে পেতাম । পুরো সপ্তাহ আমি আব্বার এই একটা দিনের জন্য অপেক্ষায় থাকতাম । যদিও আব্বা বৃহ:স্পতিবারে আসতেন ঢাকা থেকে বিকেলের মধ্যে । আমাদের স্কুল হাফ থাকত তাই স্কুল থেকে বাড়িতে এসেই আব্বার অপেক্ষা । শুক্রবার সকালে আব্বা নিয়ে যেতেন দাদা-দাদির কবর জিয়ারতে । সেখান থেকে বাড়িতে এসে বাগান বাড়িতে শাকসবজি আর ফল ফুলের গাছের পরিচর্যা করতাম । এই পরিচর্যার ফাকে আম্মা চা বিস্কিট আর শরবত খাওয়াতেন । দুপুরে একসাথে পুকুরে গোসল করে জুম্মার নামাজ শেষে একসাথে খেয়ে আব্বাকে জড়িয়ে ধরে ঘুম । আহা সেকি ঘুম বাবার বুকের মাঝে!! বিকেলে খেলাধুলা করে এসে সন্ধায় আব্বার সামনে পড়তে বসা । অন্য সবাই আব্বার সামনে পড়তে বসতে ভয় পেত কিন্তু আমি আব্বার কাছে পড়তাম । খুব মেজাজি ছিলেন কিন্তু আমার জন্য আব্বার আলাদা একটা টান ছিল সবসময় । সেটা আম্মা মারা যাবার পর খুব বেশি উপলব...

আমি যদি কাক হতাম

                   ২২ মে । আর সকল দিনের মতোই ছিল সবার জন্য । শুধু আমার আর আহিয়ানের জন্য কিছুটা ব্যতিক্রম ছিল । গতকাল ছিল তার (প্রয়াত বউয়ের) চলে যাবার ১ম বার্ষিকী । ২০২০ সালের ২২ মে , জুম্মাতুল বিদার দিনে বিকেল ৩.১৫ মিনিটের সময় সে চলে গেছে আমাদের ছেড়ে , ছোট্ট বাবুটাকে সাথে নিয়ে । এই এক বছরে অনেক কিছু বদলেছে ,      সাথে বদলেছি আমি আর নিজেকে বদলে নিয়েছে আহিয়ান । গতকাল দিনটাকে আর দশটা দিনের মতোই স্বাভাবিকভাবে কাটানোর চেস্টা করেছি । কতকটা পেরেছি আবার কতকটা পারিনি । শুধু একবার আফসোস করে ভেবেছি , " আমি যদি কাক হতাম!"   নজরুল আমার প্রিয় কবি । ছোটবেলা থেকেই । দু:খ কস্টে , দারিদ্রে , শ্রমে ঘামে , আত্মমর্যাদায় , অভিমানে বেচে থাকা নজরুল আমার খুব প্রিয় , খুবই শ্রদ্ধার । নজরুলের একটা গান/গজল ছোট বেলা থেকে খুব পছন্দ করতাম , গুনগুন করে গাইতাম । সেটা ছিল- আমি যদি আরব হতাম , মদিনার ও পথ সেই পথেতে হেটে যেতেন ,  নুর নবী হযরত (স) । কাল মনে হচ্ছিল , আমি যদি কাক হতাম!         ...