সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

অসহায় পাতাবাহার

            হুট করেই একদিন বউ কিছু পাতাবাহারের ডাল নিয়ে এসেছে বাসায়আমি জিজ্ঞাসা করলাম, এগুলা দিয়ে কি হবে? সে হেসে জবাব দিল, আমি এদের পালক নিয়েছি, এদের পেলে পুষে বড় করবো! আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম তার মুখের দিকে! বললাম, আমাকে বলতে,নার্সারি থেকে টব এনে দিতাম, সে বললো, এদের আমি ভিন্নভাবে পালবো!

শুধু পানি দিয়ে বা প্লাস্টকের বোতলে এভাবে গাছ বাচতে পারে তা আমার ভাবনার বাইরে ছিলসে বলেছিল,

"শুনেন, আমার রহমতুল্লা, শুধু অনেক ভালবাসা আর একফোটা পানি দিয়েও বেচে থাকা যায়!" আমি নির্বাক হয়ে চেয়েছিলাম তার চোখে মুখেসত্যিই কি ভালবাসার এত শক্তি?

আমরা গ্রামে বড় হয়েছিআমাদের চারপাশে মাটি আর পানির কোন অভাব ছিলনা কোনদিনযখন কোন গাছ,ফুল যাকিছু ভাললেগেছে, মাটিতে পুতে দিয়েছিপ্রথম প্রথম কিছুদিন সকাল বিকেল পানি দিয়েছি তারপর এমনিতেই গাছ ফুল বেড়ে উঠেছেসেটা কতটা অযত্ন অবহেলায় তা ভেবে দেখিনি কোন কালে! মাটির স্বাদ নিয়ে গাছ বেড়ে উঠবে এটাই চিরন্তন জেনেছিহাইস্কুলে পড়ার সময় আমাদের বাগান বাড়িতে মেঝভাইয়ের সাথে,তার অনুপ্রেরনায় ফুলের বাগান করেছিলামসেখানে গোলাপ, হাসনাহেনা, গন্ধরাজ, শিউলি, রঙ্গন,সুর্যমুখি, রজনিগন্ধা সহ অনেক ফুলের গাছ লাগিয়েছিলামতরতর করে বেড়ে উঠেছিল ফুলের গাছেরামেঝভাই চট্রগ্রাম ভার্সিটি থেকে মাসে একবার বাড়ি আসতেনতাই ভয়ে থাকতাম, গাছ গুলোর কিছু হলে ভাই আমাকে আস্ত রাখবেনামেঝ ভাইকে বড় ভালবাসতামআর ভয় ও পেতাম খুবফুল বাগানের পরিচর্যা করেছি অনেকদিন কিন্তু এত্ত নিগুড় ভালবাসা গাছের প্রতি কোনদিন বোধ করিনি

প্লাস্টিকের বোতলে শুধু পানি খেয়েই বাসায় গাছগুলি বেড়ে উঠেছিলযেদিন থেকে শিকড় গজানো শুরু হলো,সেদিন বউ আমাকে ডেকে নিয়ে বলেছিল, দেখেন রহমতুল্লা,বলেছিলাম না! আমি শুধু বাধ্য ছাত্রের মত মাথা নেড়ে বলেছিলাম, হ্যা, তুমি বলেছিলে! সে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল, আমিও একটা পাতাবাহার, আমাকেও আপনি এমন করে বাচিয়ে রাখবেনঅনেকটা ভালবাসা আর কিছুটা পানি দিয়েআমি ও হেসে খেলে, শিকড় গজিয়ে আপনার আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকবো আজীবনআমাদের ভালবাসার কোন কমতি হবেনা কোনদিন!!!

প্রতি শুক্রবারে সে তার গাছ গুলিকে নিজহাতে গোসল করাতোবাথরুমে নিয়ে গিয়ে প্রতিটা পাতায় হাত বুলিয়ে পানি ঢেলে পাতার গায়ের ময়লাধুলা ধোয়ে দিয়ে, বোতলে নতুন পানি দিয়ে আবার তাদের কে বারান্দায় রেখেদিতডাক্তার যেদিন থেকে তাকে কমপ্লিট বেড রেষ্ট দিল, গত জানুয়ারির শেষের দিক থেকে, সেই সময়ের পর থেকে গাছের যত্নের দায়িত্ব সে আমার উপর বর্তালোআমি আর আহিয়ান দুইজনে আমাদের শুক্রবারের জলকেলির পুর্বে গাছেদের গোসল করাতামসে বসে বসে দেখতো, ঠিক আছে কিনা? আমরা পেরেছি কিনা? যখন গাছেদের গোসল শেষে তাদের আবার বারান্দায় রেখে দিতে যেতাম, বউ তখন বলতো, আমার কাছে একটু দেন, আমি ছোয়ে দেই, আমার গাছগুলা আমার স্পর্ষ পাক, জেনে যাক আমি আছি!!!

আজ একসপ্তাহ পর আমি আবার বউয়ের সংসারে বেড়াতে এসেছিঘরদোর ধোয়েমুছে যেই বারান্দায় গেছি, দেখি বউয়ের পাতাবাহার গুলা ছিমিয়ে পড়েছে! অযত্ন অবহেলা হয়ত সইতে পারেনা তাই! আমি আজ ওদের যত্ন নিয়েছিজানিনা ওরা আবার জেগে উঠবে কিনা আগের মতো করে!

পাতাগুলা কি বুঝতে পারে যে কেউ একজন আর নেই?

তারা কি অনুভুতির স্বাদ পায়?

তারা কি বুঝতে পারে, আজ কেউ একজন তাদের স্পর্ষ করেনি?

মমতা মাখানো স্পর্ষ কি তাদের অপেক্ষায় রেখেছে?

 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

A perfect weekend

আব্বা বলতেন ,  A perfect holiday starts with gardening, continues with prayer and ends with a deep sleep.  আমার ছোট বেলায় আব্বা যখন  Narinda Govt. High School   এর শিক্ষক , তখন শুধুমাত্র শুক্রবার ছুটি পেতেন  আর আমি আব্বাকে সপ্তাহে ওই একদিন কাছে পেতাম । পুরো সপ্তাহ আমি আব্বার এই একটা দিনের জন্য অপেক্ষায় থাকতাম । যদিও আব্বা বৃহ:স্পতিবারে আসতেন ঢাকা থেকে বিকেলের মধ্যে । আমাদের স্কুল হাফ থাকত তাই স্কুল থেকে বাড়িতে এসেই আব্বার অপেক্ষা । শুক্রবার সকালে আব্বা নিয়ে যেতেন দাদা-দাদির কবর জিয়ারতে । সেখান থেকে বাড়িতে এসে বাগান বাড়িতে শাকসবজি আর ফল ফুলের গাছের পরিচর্যা করতাম । এই পরিচর্যার ফাকে আম্মা চা বিস্কিট আর শরবত খাওয়াতেন । দুপুরে একসাথে পুকুরে গোসল করে জুম্মার নামাজ শেষে একসাথে খেয়ে আব্বাকে জড়িয়ে ধরে ঘুম । আহা সেকি ঘুম বাবার বুকের মাঝে!! বিকেলে খেলাধুলা করে এসে সন্ধায় আব্বার সামনে পড়তে বসা । অন্য সবাই আব্বার সামনে পড়তে বসতে ভয় পেত কিন্তু আমি আব্বার কাছে পড়তাম । খুব মেজাজি ছিলেন কিন্তু আমার জন্য আব্বার আলাদা একটা টান ছিল সবসময় । সেটা আম্মা মারা যাবার পর খুব বেশি উপলব...

আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে:

মঙ্গলকাব্যের এই একটা উপাধ্যায় আমার মনে খুব রেখাপাত করেছে । আমার সন্তান যেন থাকে দুধেভাতে! প্রত্যেকটা পিতামাতার কাছেই তার সন্তান তার পরম সাধনার ধন । পিতার স্বপ্নের ফল ও ফসল । একজন পিতা কাদামাটিতে যে বীজ বুনে যায় , একজন সন্তান সেই বীজ থেকে চারা গজিয়ে দিনে দিনে তাকে মহীরুহ করে গড়ে তুলে । পিতা বেচে থাকেন আর না থাকেন , সন্তান তার পিতার স্বপ্নের জালে পালতুলে নতুন স্বপ্নের বীজ বুনে যায় পরবর্তি সন্তানের জন্যে । আর এভাবেই যুগযুগ ধরে স্বপ্নেরা বেচে থাকে , ভুমিতলে । পৃথিবীর আবাদি এভাবেই বেড়ে চলে!                    আমি আজন্ম ঘুমকাতুরে লোক । সেই ছোটবেলা থেকে সংসার জীবনের আগ পর্যন্ত আমার ঘুমের এমন অবস্থা ছিল যে একবার ঘুমিয়ে যাবার পর আমার সামনে কেহ ঢোল পিটালেও আমার ঘুমের কোন গত্যান্তর হতোনা । আমি ঘুমের কোলেই থাকতাম । আবার এমনও ছিল , নিজে থেকে জেগে উঠার আগে কেহ আমাকে ঘুম থেকে জাগালেই আমার মাথা ব্যাথা হতো খুব । একারনে সাধারনত কেহ মানে পরিচিতজনদের মাঝে কেহ আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলতোনা । আমি আমার মত করে ...

আমি যদি কাক হতাম

                   ২২ মে । আর সকল দিনের মতোই ছিল সবার জন্য । শুধু আমার আর আহিয়ানের জন্য কিছুটা ব্যতিক্রম ছিল । গতকাল ছিল তার (প্রয়াত বউয়ের) চলে যাবার ১ম বার্ষিকী । ২০২০ সালের ২২ মে , জুম্মাতুল বিদার দিনে বিকেল ৩.১৫ মিনিটের সময় সে চলে গেছে আমাদের ছেড়ে , ছোট্ট বাবুটাকে সাথে নিয়ে । এই এক বছরে অনেক কিছু বদলেছে ,      সাথে বদলেছি আমি আর নিজেকে বদলে নিয়েছে আহিয়ান । গতকাল দিনটাকে আর দশটা দিনের মতোই স্বাভাবিকভাবে কাটানোর চেস্টা করেছি । কতকটা পেরেছি আবার কতকটা পারিনি । শুধু একবার আফসোস করে ভেবেছি , " আমি যদি কাক হতাম!"   নজরুল আমার প্রিয় কবি । ছোটবেলা থেকেই । দু:খ কস্টে , দারিদ্রে , শ্রমে ঘামে , আত্মমর্যাদায় , অভিমানে বেচে থাকা নজরুল আমার খুব প্রিয় , খুবই শ্রদ্ধার । নজরুলের একটা গান/গজল ছোট বেলা থেকে খুব পছন্দ করতাম , গুনগুন করে গাইতাম । সেটা ছিল- আমি যদি আরব হতাম , মদিনার ও পথ সেই পথেতে হেটে যেতেন ,  নুর নবী হযরত (স) । কাল মনে হচ্ছিল , আমি যদি কাক হতাম!         ...