আসসালামালাইকুম! ঠিক ফজরের আজানের পর থেকেই জনাবের বাতচিত শুরু হয়ে যায়। সেই শুরু হয় আর সন্ধার আগ পর্যন্ত চলতেই থাকে। বিরামহীন কথাবার্তা চলতেই থাকে। আমার দাদী মারা যায় যখন আমার বয়স ৪/৫ বছর। ঠিক যে বয়সে আহীয়ান তার মাকে হারায়! দাদি প্যারালাইজড হয়ে বিছানায় পড়া ছিল। খাটে শুয়ে শুয়ে খালি কথাবার্তা বলতো, আপনমনে অনেকটা আমার ময়না পাখিটার মত। আনমনে তার কথা সে বলেই যাচ্ছে, কে শুনলো, কে শুনলো না,তাতে কোন আক্ষেপ নাই। সে ক্রমাগত বলেই যাচ্ছে তার কথা গুলোন-
- আসসালামালাইকুম
- বাবা, ও বাবা
- আহিয়ান, আহিয়ান
- আম্মু
- খানা দে বা এই টাইপের কিছু এখনো স্পস্ট না
সামনের রমজানে ময়নাটার বয়স ২ বছর হবে। আমার ছোট বেলার শখ ময়না পালবো, কথা বলা পাখি। আম্মার কাছে আবদার ও করেছিলাম, শুনে আম্মা কয়েকফোটা কেঁদে ছিলেন। পরে শুনেছিলাম, আম্মা একটা ময়না প্রায় ৮/৯ বছর পুষেছিলেন, এক্সিডেন্টলি সে মারা যায়। তারপর থেকে আম্মা ময়না টিভিতে দেখলেও কাদতেন। আম্মা বেচে থাকার পর্যন্ত আর সাহস পাইনি ময়না পালার।
বছর দুই আগে ময়নার বাচ্চা নিয়ে হাজির হলাম বাসায়। তখন এর বয়সছিল ১৫/২০ দিন। প্রথমে বউ (প্রয়াত) খুব ক্ষেপে গিয়েছিল,তাকে না বলে কেন আনলাম! খুবই বিরক্তির ছিল ময়না পালার প্রথম ৩ মাসের অভিজ্ঞতা। সারাক্ষন শুধু চিল্লাইত। আধাঘন্টা পরপর খাইয়ে দিতে হত। নিজে খেতে পারতনা। একবার খাওয়ানোর ঠিক ১০/১৫ মিনিট পর থেকেই জনাবের চিল্লানো শুরু হইতো। যতক্ষন ওনাকে নলাতুলে না খাওয়াত,ততক্ষন চিল্লাইতো। আর ৪ মাস বয়স হবার পর থেকে নিজে খেতে শিখেছিল।
ময়না পালার সবচেয়ে যন্ত্রনার দিক হলো এর পটি। এরা খাওয়ার ঠিক সাথে সাথেই পায়খানা করতে থাকে। মাঝে মাঝে এদের পায়খানার পরিমান দেখে মনে হয়, ময়নাকে ১ কেজি খাওয়ালে এরা মনে হয় সোয়াকেজি পটি করে। দুইদিন পরপর এদের পটি ট্রে পরিস্কার করতে হয়। নিয়মিত গোসলের পানি দিতে হয়, গরমের দিনে ঠান্ডাপানি আর শীতের দিনে কুসুম গরমপানি। পানি জনাবের পছন্দমত না হইলে আবার গোসল করেনা। খাবার থেকে পানি পর্যন্ত এনাদের রুচি খুবই হাই লেভেলের কিন্তু সমস্যা একটাই এদের পায়খানা। খুবই বিশ্রীগন্ধ আর বিরাট পরিমান!
কথা শুনলে বা ময়নাকে কথা বলতে দেখলে যে কারোরই মনে ইচ্ছা জাগবে একটা ময়না পালার। একটা ময়না আপনি কিনতেও পারবেন খুব সহজে,কিন্তু এর পরিপালন করা যতটা ধৈর্যের, যতটা শ্রমের, যতটা প্যাশনেট হবার, বাস্তবিক পক্ষে অতটা তালমেলানো খুব কস্টের। আর আপনার ফ্যামিলির বাদবাকি লোকেরা ও যদি তার জন্য যথেষ্ট আন্তরিক না হয়, তাইলে আপনি একা চাইলেও একটা ময়নাকে ভালভাবে পালতে পারবেন না।
অবাক করার মতো ব্যাপার ছিল, আমার প্রয়াত বউ যে ময়নাটাকে কিনেছি বলে আমার সাথে রাগ-অভিমান করেছিলো, সে এতটা আপন করে নিয়েছিল ময়নাকে, ভাবতে এখনও আমি অবাক হই। ২০১৮ সালের ডিসেম্বর এ আমরা ভারতে গিয়েছিলাম। ময়নাকে আমার বোনের বাসায় রেখে। সে ইন্ডিয়া থেকে প্রায় প্রতি বেলাতে আপার কাছে ফোন দিয়ে খবর নিতো, ময়না খাইছে কিনা?
খুব ব্যস্ত একটা দিন সম্ভবত সেদিন আমরা দিল্লি থেকে ট্রেনে আজমির শরিফ গিয়েছি আর দিনের শেষে আবার ট্রেনে চড়ে জয়পুর গেলাম। সন্ধার পর হোটেলে ফ্রেশ হয়ে আমি সটান হয়ে শুয়ে গেলাম এসি অন করে। দেখলাম পাশে বসা বউ(প্রয়াত) আমার বোনের কাছে ফোনে বলছে,
- আপা, ময়নাটার একটু আওয়াজ শোনাবেন?
- মোবাইলটা একটু ওর সামনে ধরবেন?
মানুষ এমনই। মায়ার কাংগাল। সময়ের ফেরে মানুষ বদলায়। যেখানেই ভালবাসার স্পর্ষ পায়, মানুষ সেখানেই বিগলিত হয়ে যায়।
ভালবাসা আর মানুষের মাঝে সম্পর্ক অনেকটা মোম আর আগুনের মত। দুইজনে আলাদা থাকে। দুই চরিত্রের দুইজন। কিন্তু একসাথে থাকতে গিয়ে দুইজনে হারায় দুইজনায়।
সেটা মোম আগুনে, নয়তো আগুন মোম-এ!
বড় বিচিত্র মানব জীবন!!!
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন