সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

হলুদিয়া পাখি

আজ ২৯ এপ্রিল।

আমার হলুদিয়া পাখির(পরলোকগত বউ) জন্মদিন। আবার আজ জুম্মাতুল বি'দা।

২০২০ সালের জুম্মাতুল বি'দার দিনে দুপুর সোয়া তিনটায় সে আমাদের ছেড়ে অনন্তের পানে রওনা দিয়েছিলো।চলে যাবার ১০/১৫ মিনিট আগেও স্বাভাবিক কথাবার্তা হয়েছিলো তার সাথে।

সেই ছোট বেলায়, 

শীত চলে যাবার পর যখন বসন্ত আসতো, তখন আমাদের চারপাশে ঝিমিয়ে পরা গাছের ডালে নতুন সবুজ পাতার সাথে কুকিলের কুহুতান আর হলদে পাখির আনাগোনা দেখা যেতো। আমরা কুকিলের ডাকের রিপ্লাই দিয়ে তাকে রাগিয়ে দিতাম আর একসময়ে বিরক্ত হয়ে সে পালিয়ে যেতো। তখন আমরা দল বেধে বনে বাদাড়ে ঘুড়ে বেড়াতাম হলুদিয়া পাখির খোজে! 

হলুদিয়া পাখি চুপিসারে গাছের ডালে বসে থাকতো। খুব একটা ডাকাডাকি করতোনা। আমরা গুলতি নিয়ে হলুদিয়া পাখি শিকার করার জন্যে পাগল থাকতাম। কারন একটা মরা হলুদিয়া পাখি কবিরাজদের কাছে ২০/২৫ টাকায় বেচতে পারতাম। কবিরাজেরা হলুদিয়া পাখি দিয়ে জন্ডিসের ঔষধ বানাতো।আর কোন রকমে একটা পাখি বেচতে পারলে আমাদের ক্রিকেট খেলার একটা টেনিস বল আর একটা কসটেপ কিনতে পারতাম। তখনকার দিনে একটা হ্লুদিয়া পাখি মানেই আমাদের খেলার জন্যে একটা 'টেপ-টেনিস' বল। খুবই আকাংখিত ছিলো তখন।

২০১১ সালের ১২ই এপ্রিল। 

আমি তখন এনসিসি ব্যাংক এর এলিফ্যান্ট রোড শাখায় চাকরি করি। সেদিনে আমার হলুদিয়া পাখিটারে বলেছিলাম খুবই অনুনয় করে, ১৪ এপ্রিল 'নববর্ষের' দিনে আমি তাকে হলুদ শাড়িতে বাঙ্গালী বধু সাজে দেখতে চাই। সে সব দিনে কেবল মাত্র আমাদের সম্পর্কের কথা আমাদের দুই পরিবারে জানাজানি হয়েছে। সে মোটামুটি রকমের প্রেশারে ছিলো তখন আমাদের রিলেশান নিয়ে।

কোনভাবেই তাকে রাজি করাতে পারছিলাম না। তার বরাবর একই কথা, 

         "আব্বু কিছুতেই বের হতে দিবেনা এই দিনে।"

১৪ই ফেব্রুয়ারী কিংবা ১৪ এপ্রিল কোনভাবেই সে বাড়ির বাইরে বেরোতে পারতোনা। তার বাবা এলাও করতোনা। আমার খুবই মন খারাপ হয়েছিলো সেদিনে। হুট করে রাতের বেলায় সে জানালো, 

  " রহমতুল্লা, আল্লাহ মনে হয় আপনার চাওয়া কবুল করবে!

আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম, কিভাবে?

সে জানিয়েছিলো, ১৩ এপ্রিল সে একটা গায়ে হলুদের প্রোগ্রামে যাবে! সে উপলক্ষে হলুদ শাড়িতে সে আমার সামনে দেখা দিতে পারে!

১৪ ই এপ্রিল সরকারি ছুটি তাই ১৩ এপ্রিল কোনভাবেই অফিস থেকে ছুটি নিতে পারবোনা! ম্যানেজার স্যার খুবই কড়া! জীবনে এই প্রথম মিথ্যা বলে অফিস থেকে ছুটি নিয়েছিলাম।স্কুল লাইফ থেকে শুরু করে চাকুরির জীবনে কোনদিনেও মিথ্যা বলে ছুটি নেইনি। সেইবারই প্রথম, ম্যানেজার স্যার দুপুর বেলায় মোবাইলে কল দিয়ে জানতে চেয়েছিলেন, কেমন আছি? জানিয়েছিলাম, আমি মেসেই আছি। স্যালাইন খাচ্ছি! স্যার কনফার্ম হবার জন্যে আমাদের মগবাজার শাখার একটা পিওন দিয়ে আমার মেসে ডাব আর চিড়াগুড় পাঠিয়েছিলেন।ভাগ্য ভালো ছিলো,আমি তখন ও মেসেই ছিলাম! ইজ্বত বেচে গিয়েছিলো, হয়তো জীবনে প্রথমবার বলে!

দুপুরে খেয়ে কুমিল্লার উদ্দ্যেশ্যে রওনা দেই।

ঠিক সন্ধার পরপর সে কান্দিরপাড় এর বধুয়া পার্লার থেকে হলুদ শাড়ি পরে একেবারে চিরচেনা বাঙ্গালী কুল-বধু সাজে বেরিয়ে এসেছিলো। আমাদের রিলেশান এর দিনে ২০০৯ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত এই দীর্ঘ সময়ে আমরা দেখা করতাম বধুয়া পার্লারের গলিতে কয়েক মিনিটের জন্যে। কেউ দেখে ফেলবে এই ভয়ে! 

সেদিনে আমি এতোটাই মন্ত্র-মুগ্ধ হয়ে তাকে দেখেছিলাম যে আশেপাশের সকল উপস্থিতি ভুলে গিয়েছিলাম। তার সাথে তার ফুফাতো বোনও ছিলো। কিন্তু আড়াল থেকে আমি শুধু তাকেই দেখেছিলাম। আমার হলুদিয়া পাখিটাকে!

আমি সেদিনে তার সাথে দেখা করিনি।

হলুদ শাড়ি পরে রাস্তায় অনেকটা সময় সে দাঁড়িয়েছিলো। আমাকে কল দিচ্ছিলো কিন্তু আমি ধরছিলাম না। এভাবে অনেকটা সময় দাঁড়িয়ে থাকার পর, আমার দেখার মুগ্ধতা যখন কিছুটা কমে এসেছিলো তখন কল ধরে তাকে জানিয়েছিলাম, আমি আসলে আসিনি কুমিল্লায়!

সে রাগের চোটে তার মোবাইলটা রাস্তায় আছার মেরে ছিলো! আমি ফিরতি বাসেই ঢাকায় ফিরেছিলাম।

আসলে সেদিনে তাকে হলুদ শাড়িতে দেখে এতটাই বিমোহিত হয়েছিলাম যে, তাকে কাছ থেকে দেখার সাহস পাইনি। আমার মনে হয়েছিলো, একবার তার সামনে দাড়ালে আমি আর নিজেকে কনট্রোল করতে পারবোনা! হয়তোবা হাজারো লোকের সামনেই তাকে জড়িয়ে ধরতে পারি অথবা মন যা চায় তা-ই করে ফেলতে পারি! সেই ভয়ে তাকে বলেছিলাম, আমি সেদিনে কুমিল্লা যাইনি।

সেদিন থেকে প্রায় কয়েকদিন সে রাগ করে আমার সাথে কথা বলেনি যেখানে এক ঘন্টা কথা না বলে সে থাকতে পারতোনা। মনে পরে, একদিন রাতে তাকে কল দেয়া শুরু করেছিলাম রাত ১১ টায়, ঠিক ফজরের আজান পর্যন্ত কয়েক হাজার কল দিয়েছিলাম তার মোবাইলে! কিন্তু রাগের চোটে সে কল ধরেও নি আর কথাও বলেনি। এই সময়ে না খেয়ে থাকতে থাকতে সে এতটাই দুর্বল হয়ে গিয়েছিলো যে তাকে স্যালাইন দেয়া লেগেছিলো!

এ ঘটনার অনেকদিন পর যখন আবার সবকিছু স্বাভাবিক হয়েছিলো তখন আমি স্বীকার করেছিলাম যে, সেদিন আমি দূর থেকে, রাস্তার ওপার থেকে তাকে দেখেছিলাম। সে বিশ্বাস করতে চায়নি, আমি খুটিয়ে খুটিয়ে তাকে বলেছিলাম, সেদিনে আমি কি দেখেছি, সে কি কি অর্নামেন্ট পরেছিলো, তার পাশে কে কে ছিলো, সে রিক্সার ঠিক কোনপাশে বসেছিলো, সে আগে উঠেছিলো নাকি তার ফুফাতো বোন, এইসব খুটিনাটি ঠিকঠিক বলার পর তার বিশ্বাস হয়েছিলো, যে আমি কুল-বধু সাজে তাকে দেখেছি! আমাকে প্রশ্ন করেছিলো, কেন তাইলে তার সাথে দেখা করিনি?

আমি বলেছিলাম আমার আশংকার কথা!

সে শুনে হেসেছিলো খুউব। বলেছিলো, 

' আহারে রহমতুল্লা, কেমন পুরুষ হইলেন, এই একটা সাহসের কাজও আপনি করতে পারবেন না? কি কারনে প্রেম করতে গেলেন?"

সেদিনের হলুদের প্রোগ্রামের কয়েকটা ছবি সে আমাকে কিছুদিন পর কুরিয়ার এ দিয়েছিলো!

আজ,

 ২৯ শে এপ্রিল ২০২২.

আজ তার জন্ম ও চলে যাবার দিন।

অনেকটা কাকতালীয় ই বলবো। 

২০২০ সালের জুম্মাতুল বি'দার দিনে সে হাসপাতাল থেকে জোড় করে আমাকে বাসায় পাঠিয়েছিলো জুম্মার নামাজ পড়ার জন্যে। বলেছিলো, ৫ টার দিকে বাসায় ফিরে ইফতারি বানাবে, আমরা, আহিয়ান, আমি আর সে একসাথে ইফতারি করবো! সন্ধায় সে ঈদের বাজার সদাইয়ের লিস্ট করবে! ঠিক ঈদের ৩/৪ দিন পর তার সিজার হবে। একটা মেয়ে বাবু আসবে আমাদের মাঝে, আহিয়ানের একটা লাল-টুকটুকে বোন হবে, যদিও আল্ট্রা করার সময়ে ডাক্তারের কাছে জানতে চায়নি ছেলে না মেয়ে! আমাদের দুই জনের দৃঢ় বিশ্বাস ছিলো একটা লাল- পরী আসবে আমাদের। একটা লাল রঙ এর চুলের ক্লিপ ফিতা সমেত সে কিনে রেখেছিলো

। মেয়ের চুল ফেলে দেবার আগে লাল ফিতা বেধে ছবি তুলে বাধিয়ে রাখবে বলে!

সে আর ফেরেনি। 

একটা লাল-টুকটুকে মেয়ে বাবুকে এই পৃথিবীর আলো না দেখিয়ে নিজের সাথে নিয়ে অনন্তের পানে পাড়ি জমিয়েছে! আজও খুজে পাইনি, কেন তার এত অভিমান জ্বমে ছিলো আমার আর আহিয়ানের উপর!

একটা লাল ফিতা চুলের ক্লিপ সহ আমার বুকে বেধে গিয়েছে চীরতরে, একটা হলুদ শাড়ি পরা কুল-বধুর গায়ে হলুদের বেশ-কটা ছবি আমাকে চিরস্থায়ী সম্পত্তিরূপে বুঝিয়ে দিয়ে আমার হলুদ পাখিটা উড়াল দিয়েছে উর্ধাকাশে! 

সাত আসমান- সাত জমিন ছাড়িয়ে অসীম শুন্যতার মাঝে সিদরাতুলমুনতাহা! তারপর আরো উপরে স্বর্গ-নরক! তারো উপরে আরসে আজীম, যার আর কোন উপর নাই! শুনেছি আমাদের মর্তের পৃথিবীর উপরে কয়েকশত কোটি মাইল পথ আলোর গতিতে ছুটলে মাত্র ১ম আকাশে পৌচ্ছা সম্ভব।

সে হিসাবে কতটা পথ একাকি সে পাড়ি দিয়ে তা মাঝ রাতের আকাশের পানে চেয়ে মাঝে মাঝে হিসাব করি!


আর অজানার উদ্দ্যেশ্যে জিজ্ঞাসা করি,

" হলুদিয়া পাখি, সোনারো বরন

পাখিটি ছাড়িলো কে?"


আমি আর আহিয়ান অনেক ভাল আছি।

তুই ভাল থাকিস আমার প্রিয়,

" হলুদিয়া পাখি।"

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

A perfect weekend

আব্বা বলতেন ,  A perfect holiday starts with gardening, continues with prayer and ends with a deep sleep.  আমার ছোট বেলায় আব্বা যখন  Narinda Govt. High School   এর শিক্ষক , তখন শুধুমাত্র শুক্রবার ছুটি পেতেন  আর আমি আব্বাকে সপ্তাহে ওই একদিন কাছে পেতাম । পুরো সপ্তাহ আমি আব্বার এই একটা দিনের জন্য অপেক্ষায় থাকতাম । যদিও আব্বা বৃহ:স্পতিবারে আসতেন ঢাকা থেকে বিকেলের মধ্যে । আমাদের স্কুল হাফ থাকত তাই স্কুল থেকে বাড়িতে এসেই আব্বার অপেক্ষা । শুক্রবার সকালে আব্বা নিয়ে যেতেন দাদা-দাদির কবর জিয়ারতে । সেখান থেকে বাড়িতে এসে বাগান বাড়িতে শাকসবজি আর ফল ফুলের গাছের পরিচর্যা করতাম । এই পরিচর্যার ফাকে আম্মা চা বিস্কিট আর শরবত খাওয়াতেন । দুপুরে একসাথে পুকুরে গোসল করে জুম্মার নামাজ শেষে একসাথে খেয়ে আব্বাকে জড়িয়ে ধরে ঘুম । আহা সেকি ঘুম বাবার বুকের মাঝে!! বিকেলে খেলাধুলা করে এসে সন্ধায় আব্বার সামনে পড়তে বসা । অন্য সবাই আব্বার সামনে পড়তে বসতে ভয় পেত কিন্তু আমি আব্বার কাছে পড়তাম । খুব মেজাজি ছিলেন কিন্তু আমার জন্য আব্বার আলাদা একটা টান ছিল সবসময় । সেটা আম্মা মারা যাবার পর খুব বেশি উপলব...

আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে:

মঙ্গলকাব্যের এই একটা উপাধ্যায় আমার মনে খুব রেখাপাত করেছে । আমার সন্তান যেন থাকে দুধেভাতে! প্রত্যেকটা পিতামাতার কাছেই তার সন্তান তার পরম সাধনার ধন । পিতার স্বপ্নের ফল ও ফসল । একজন পিতা কাদামাটিতে যে বীজ বুনে যায় , একজন সন্তান সেই বীজ থেকে চারা গজিয়ে দিনে দিনে তাকে মহীরুহ করে গড়ে তুলে । পিতা বেচে থাকেন আর না থাকেন , সন্তান তার পিতার স্বপ্নের জালে পালতুলে নতুন স্বপ্নের বীজ বুনে যায় পরবর্তি সন্তানের জন্যে । আর এভাবেই যুগযুগ ধরে স্বপ্নেরা বেচে থাকে , ভুমিতলে । পৃথিবীর আবাদি এভাবেই বেড়ে চলে!                    আমি আজন্ম ঘুমকাতুরে লোক । সেই ছোটবেলা থেকে সংসার জীবনের আগ পর্যন্ত আমার ঘুমের এমন অবস্থা ছিল যে একবার ঘুমিয়ে যাবার পর আমার সামনে কেহ ঢোল পিটালেও আমার ঘুমের কোন গত্যান্তর হতোনা । আমি ঘুমের কোলেই থাকতাম । আবার এমনও ছিল , নিজে থেকে জেগে উঠার আগে কেহ আমাকে ঘুম থেকে জাগালেই আমার মাথা ব্যাথা হতো খুব । একারনে সাধারনত কেহ মানে পরিচিতজনদের মাঝে কেহ আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলতোনা । আমি আমার মত করে ...

আমি যদি কাক হতাম

                   ২২ মে । আর সকল দিনের মতোই ছিল সবার জন্য । শুধু আমার আর আহিয়ানের জন্য কিছুটা ব্যতিক্রম ছিল । গতকাল ছিল তার (প্রয়াত বউয়ের) চলে যাবার ১ম বার্ষিকী । ২০২০ সালের ২২ মে , জুম্মাতুল বিদার দিনে বিকেল ৩.১৫ মিনিটের সময় সে চলে গেছে আমাদের ছেড়ে , ছোট্ট বাবুটাকে সাথে নিয়ে । এই এক বছরে অনেক কিছু বদলেছে ,      সাথে বদলেছি আমি আর নিজেকে বদলে নিয়েছে আহিয়ান । গতকাল দিনটাকে আর দশটা দিনের মতোই স্বাভাবিকভাবে কাটানোর চেস্টা করেছি । কতকটা পেরেছি আবার কতকটা পারিনি । শুধু একবার আফসোস করে ভেবেছি , " আমি যদি কাক হতাম!"   নজরুল আমার প্রিয় কবি । ছোটবেলা থেকেই । দু:খ কস্টে , দারিদ্রে , শ্রমে ঘামে , আত্মমর্যাদায় , অভিমানে বেচে থাকা নজরুল আমার খুব প্রিয় , খুবই শ্রদ্ধার । নজরুলের একটা গান/গজল ছোট বেলা থেকে খুব পছন্দ করতাম , গুনগুন করে গাইতাম । সেটা ছিল- আমি যদি আরব হতাম , মদিনার ও পথ সেই পথেতে হেটে যেতেন ,  নুর নবী হযরত (স) । কাল মনে হচ্ছিল , আমি যদি কাক হতাম!         ...