সম্ভবত ১৯৯২/৯৩ সালের দিককার ঘটনা।
এই প্রথম বার মুরুগীটা ডিম পেরেছে। দেখতে অনেকটা বাচ্চা মুরগীর মতো।কেউ দেখলে বিশ্বাসই করবেনা যে এই বাচ্চা মুরগীটা ডিম পেরেছে! ছোট্ট একখানা ডিম পেরেই জনাব কক-কক করতে করতে পুরো বাড়ি মাথায় তুলে ফেলতেছে। কিছুতেই তার বকবকানি থামছেনা। যেন সে পুরো এলাকাবাসিকে জানাতে চাইছে যে, সে একখানা ডিম পেরেছে! পাশের ঘরের চাচা বসে ছিলেন উঠানের এককোনে। উনার পাশ দিয়ে বাগদিতে দিতে যাবার কালে তিনি ধাপ করে মুরগিটা ধরে ফেললেন আর তার পাছা থেকে বড় একটা পালক হেচকাটানে তুলে নিলেন! মুরগীটা আচমকা কি হলো বুঝতে না পেরে কোনাকোনি একটা দৌড় মারলো। বেচারা কোথায় একটু ক্রেডিট নিতে চাইলো, প্রথম ডিম পেরেছে বলে,সেখানে বেরসিক চাচা......!
মুরগির পালকটা হাতে নিয়ে, সেটার নীচের অংশের লোমগুলা তুলে নিয়ে বাকি মাথার অংশটাকে একটু পেচিয়ে চাচা পুরেদিলেন কানের ভেতর। আর পাখার গোড়াটা শক্তকরে ধরে মোচরানো শুরু করলেন। ঠিক সেই মুহুর্তে চাচার ভাব-ভংগী দেখে মনে হচ্ছিলো যেনো তিনি স্বর্গসুখ পাচ্ছেন!
আমাদের গ্রাম দেশের লোকেরা কান চুলকাতে অনেক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে থাকে। তার মাঝে হাস-মুরগীর পাখা অন্যতম।এমনকি গ্রামের বাজারে যে লোকেরা কান পরিস্কারের ব্যবসা করে তারাও হরেক রকমের যোগাড়যন্ত্র দিয়ে কান পরিস্কার করে শেষ অংসে হাস-মুরগির পালক দিয়ে একটু সুরসুরি দিয়ে স্বর্গীয় আরাম দেয়ার মাধ্যমে কার্জ সমাধা করে। বড়দের দেখাদেখি আমরাও হাতের কাছে যা পেতাম তা দিয়েই কান চুলকাতাম। মনে পরে প্রাইমারি স্কুলের দিনে Econo কলমের ক্যাপের হুক বাকা করে কান চুলকাতাম!
এখন দিন বদলাইছে।
কান চুলকানোর জন্যে কটনবাড কিনতে পাওয়া যায়। আবার নানান ইলেকট্রিক যন্ত্রও আছে। আমাদের সন্তানেরা সুন্দর করে কটনবাড দিয়ে কান পরিস্কার করতে শিখেছে। ইদানিং আবার একদল গবেষক বলা শুরু করেছে, কান পরিস্কার করার কোন প্রয়োজন নাই। এমনিতেই কান পরিস্কার হয়ে যায়। তাদের ভাষ্যমতে কান পরিস্কার করতে গিয়ে কানের পর্দা ফেটে যাবার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
ছুটির দিনে বাবা-ছেলে মিলে পোষাদের খাচা পরিস্কার করছিলাম। ময়না, টিয়ার সাথে ৪ জোড়া কবুতর আছে আমাদের। আহিয়ান কে নিয়ে কবুতরের খাচা পরিস্কার করতে গিয়ে দেখলাম বড় কয়েকটা পালক পরে আছে খাচার আশেপাশে। ছোটবেলার সেই চাচার মতো করে পালক কিছুটা ছেঁটে আহিয়ানকে ডেকে কোলে বসালাম। যেই মাত্র পালক দিয়ে কানের আশেপাশে মুচর দিলাম, আহিয়ান হো-হো করে হেসে উঠলো আর বল্লো,
বাবা, কাতুকুতু লাগে!
ভেবে দেখলাম,
একসময়ে এই কাতুকুতু পাবার জন্যে মানুষ গঞ্জের হাটে গিয়ে পয়সা খরচ করতো। হাস-মুরগীর পালক দিয়ে মোচর দিয়ে স্বর্গীয় 'কান-সুখ' পেতো।
এখন হাস-মুরগির পালক ও আছে বিস্তর।
কানের জায়গাতে কান ও আছে।
নাই শুধু সুখের সেই স্বাদ, তৃপ্তি কিংবা আকাঙ্ক্ষা।
ইট-কাঠের জঞ্জাল আমাদের আধুনিক বানিয়ে "কান-সুখ" নামের অনুভুতি গুলো কেড়ে নিয়েছে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন