২০০৯ সালের ৪ অক্টোবর, রাত আনুমানিক ১১ টার দিকে আমার নাম্বারে একটা কল আসে, নাম্বারটা সেইভ করা ছিলো (Taout) টাউট দিয়ে। কল রিসিভ করতেই ফোনের অপরপ্রান্ত থেকে ভেসে এসেছিলো, হ্যা আমি আপনার শর্তে রাজি!
গতকাল ছিলো ৪ অক্টোবর ২০২১, আমাদের সম্পর্কে জড়ানোর একযুগ পুর্তি। ২০০৯ সালের ৪ অক্টোবর আমরা একসাথে বাচবো বলে একমত পোষন করেছিলাম। আজ একযুগ পেরিয়ে আমরা দুইজনে দুই ভুবনের বাসিন্দা।
আমি আর সে, আমার পরলোকগত বউ, আমরা দুইজনে ছিলাম দুই চিন্তাধারার মানুষ। চিন্তায়,বিশ্বাসে, চলাফেরায়, কথাবার্তায় দুইজনে দুই মেরুর বাসিন্দা। সেইসব দিনে আমি খুব ব্যস্ত সময় পার করতাম। সকাল ৯ টা থেকে সন্ধ্যা ৬ টা পর্যন্ত বনানী তে অফিস, ৬.৩০ থেকে ৯.৩০ পর্যন্ত ইস্ট ওয়েস্ট ভার্সিটিতে এমবিএম, রাত ১১ টার মাঝে বাসায় ফিরে ফ্রেশ হয়ে খেয়ে দেয়ে Accounting মাস্টার্স এর পড়াশোনা, ভার্সিটির পড়া, চাকুরির প্রস্তুতি, আড্ডা, টিভি দেখা, রাত ২/২.৩০ টার মাঝে ঘুম আর সকাল ৭.৩০ এ উঠে আবার দিনকার দৌড়ঝাপ। এই দমফেলার ফুরসত না পাওয়া সময়ে ঠিক আমার বিপরীতমুখি একজন মানুষের সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছিলাম।
তাকে সবাই জানতো প্রচন্ড জেদি, বদমেজাজি আর অহংকারি একটা মেয়ে হিসেবে। আমি চিনতাম প্রচন্ড একরোখা, জেদি আর খুবই উচ্চাভিলাষী মেয়ে হিসাবে। পুর্ব পরিচিত হিসাবে তার সাথে খুব একটা কথা হতোনা আমার। অক্টোবর মাসের ঠিক ২/৩ মাস আগে, সে আমাকে একদিন ফোন করে তার ব্যক্তিগত কিছু সমস্যার সমাধান চেয়েছিলো। ব্যক্তিগত জীবিনে সেই সময়ে সে খুবই অশান্তিতে ছিল।তাকে তার সমস্যার সমাধান দিতে গিয়ে রেগুলার কথাবার্তা বলতে বলতে এক সময়ে দেখলাম আমরা দুইজনেই কেমন যেন কাছাকাছি চলে আসতেছি। আমি তখন নিজেকে গুটিয়ে নিতে গেলে সে আমাকে একদিন জিজ্ঞাসা করেছিলো, আপনি আমাকে খুব ইগনোর করেন তাই না?
অভিমানে সে আবার কিছুদিন কথা বলা বন্ধ রেখেছিলো, কিন্তু অভিমান খুব বেশিদিন টিকেনি। আমাকে আমি বদলে নিতে বাধ্য হয়েছিলাম। যখন বুঝতে পেরেছিলাম যে আমরা কিছুটা মায়াজালে আটকে গেছি তখন তাকে কিছু শর্ত দিয়েছিলাম সম্পর্ক করতে। আমি যেমন শর্ত দিয়েছি তেমন সেও আমাকে তার শর্ত দিয়েছিলো। ২৭ সেপ্টেম্বর আমরা দুইজনে দুইজনের শর্ত ঠিক করেছিলাম। ভেবে চিনতে ডিসিশান নিতে বলেছিলাম তাকে! ৪ অক্টোবর ফোন করে সে জানিয়েছিলো আমার শর্তে সে রাজি, আরো জানতে চেয়েছিলো আমি তার শর্তে রাজি কিনা?
টাউট নাম দেয়া মেয়েটাকেই ভালবেসেছিলাম সেদিন। ২০০৯ এ সম্পর্কে জড়ানো, ২০১৩ তে গোপনে বিয়ে, ২০১৫ তে সংসার জীবন শুরু, ২০১৯ এর অক্টোবর পর্যন্ত পরিবারের কারোসাথে কোনরুপ যোগাযোগ না করে দুইজনের ভরসায় দুইজনে চলে সুখের সংসার গড়া আর ২০১৯ এর নভেম্বর এ প্রথম বাবা মায়ের সাথে দেখাসাক্ষাত করে ২০২০ এর ২২ মে চীর প্রস্থান! আজ সম্পর্কের এক যুগ পেরিয়ে আমরা দুইজনে দুই পৃথিবীর বাসিন্দা!
ছোটবেলা থেকেই ভাবতাম স্বর্নের খনিতে হয়তো বড়বড় স্বর্ন খন্ড থাকে আর লোকেরা বোমা মেরে সেই বিরাটকার খন্ডকে টুকরা টুকরা করে এনে স্বর্ন বার আর গহনা বানায়। কিন্তু বড় হয়ে দেখলাম টন টন মাটির ভাজে ভাজে মরিচের দানার মতো কিংবা উড়ে বেড়ানো ছাইয়ের মতো ক্ষুদ্রকায় সাইজের স্বর্ন থাকে। লোকেরা খনি থেকে সেই বিপুল পরিমান মাটির মাঝ থেকে মরিচের দানার মতো স্বর্নখন্ড ধীরেধীরে জমা করে, তাপে পুড়িয়ে স্বর্ন খন্ড আর গহনা বানায়।
মানব জীবনে সুখের উপস্থিতি অনেকটা মাটি খুজে বের করা স্বর্নের মতো। ছোট ছোট সুখের মুহুর্তগুলা, অনুভুতি গুলাকে একেএকে জমা করে ভালবাসায় পুড়িয়ে এক একটা সুখের গহনা বানাতে হয়। দূর থেকে অন্যেরা কিন্তু দেখে বিরাটাকার স্বর্ন খন্ড কিন্তু সুখের সংসারে থাকা লোকগুলা মরিচের দানার মতো কিংবা উড়ে বেড়ানো ছাইয়ের দানার মতো সুখের কনাগুলাকে জমা করে গড়ে তুলে সুখের নীড়! যেমনটা গড়েছিলাম আমরা দুইজনে!
স্বার্থপর আমি এখন ভাল থাকার চেস্টায় আছি। আবার বিয়ে করেছি। কদিন হলো আল্লাহ আমাকে আরেকটা বাবা দিয়েছেন, আহিয়ান তার একটা ছোট ভাই পেয়েছে, দুই ছেলে আর বউকে নিয়ে ভাল থাকার আপ্রান চেস্টা করে যাচ্ছি।কতকটা পারছি কতকটা হয়তো পেরে উঠছিনা!জীবন তার নিজস্ব গতীতেই ছুটে চলেছে! শুধু........
গতকাল আমাদের সম্পর্কের এক যুগ পুর্তিতে ছুটে গিয়েছিলাম তার কাছে। অনেকটা সন্তোপর্নে ১২ টা টকটকে লালগোলাপ রেখে এসেছি তার শিয়রে। বলে এসেছি, নিস্তব্ধ একেলা রাতে, যখন পৃথিবীর সব কায়া ঘুমের রাজ্যে বিভোর হয়ে যাবে, ঠিক তখন একাকি স্পর্ষে, অনুভবে জেনে নিও! আমি এসেছিলাম, তোমার প্রিয় লালগোলাপ হাতে, আস্থা আর বিশ্বাসের স্বর্গীয় সম্পর্কের এক যুগ পুর্তীতে!!!
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন