একটা খালি রঙ এর বালতি মুখবন্ধ পড়ে আছে আজ প্রায় ২/২.৫ বছর। খুলে দেখিনি কি আছে ভেতরে। বাসায় কোথায় কি আছে দেখার ইচ্ছে হয়না কখনো। আজকে কি মনেকরে খুলে দেখতে গেছি,কি আছে ভেতরে? ঢাকনা খুলে দেখলাম সিডমিক্স। ধান, সুর্যমুখীর বিচী, কুসুমদানা, কেনারি,মিলেট,তিসি সহ বেশ ক'ধরনের সিড। নাড়া দিতে দেখলাম সিডগুলার উপর বেশকিছু নিমপাতা আর গুটিকতক শুকনামরিচ পড়ে আছে!
আজ থেকে বছর তিন আগে একজোড়া ককাটেল আর একজোড়া টিয়া পাখি বাসার বারান্দায় পোষেছিলাম। ককাটেল আর টিয়া পাখিগুলাকে সিডমিক্স খেতে দিতাম। বারবার কিনতে বিরক্তলাগে বলে একসাথে অনেকটা সিডমিক্স কিনেছিলাম। ব্যাংক বন্ধের দিনে সাধারনত আহিয়ান আর আমি একসাথে পুরোটা সময় কাটাই। সেদিন সম্ভবত ছিলো শনিবার। বাপ-বেটায় বসেছিলাম সিডমিক্স রেডি করতে আর সংরক্ষন করতে!
বাজার থেকে কেনে আনা সিডের ভেতর পোকা আর ময়লা থাকে বলে সবগুলা সিডের প্যাকেট একসাথে নিয়ে বসে কাপড় দিয়ে মুছে, ঝেড়ে পরিস্কার করতেছিলাম। সাধারনত আহিয়ান আমার সহকারি হিসাবে থাকে। একটু পরপর সে বলে,
বাবা, আমি একটু হেল্প করি?
সে পারুক বা না পারুক, এটা সে বলবেই। আমিও ইচ্ছে করেই ওকে সাথে নিয়েই কাজকর্ম করি। যাতে সে দেখে শিখতে পারে। সেদিনেও হাত লাগিয়েছিলো আমার সাথে। আমাদের সিডমিক্স ছেড়েমুছে পরিস্কার করে একসাথে মিশিয়ে যখন বালতিতে রাখতে যাবো ঠিক তখন বউ( প্রয়াত) এসে বল্লো,
এইভাবে বাক্সে ভরে রাখলে কালকে সকালেই দেখবেন এগুলাতে পোকায় ভরপুর হয়েগেছে। সে আবার সব কাজ নিখুঁতভাবে করতো আর পিপড়া, পোকামাকড় তার খুবই অপছন্দের বিষয় ছিলো। তাই ঘরে কোনকিছু রাখার সময়ে সে এমন সব ব্যবস্থা নিয়ে নিতো যাতে পোকা বা পিপড়ার কোন আনাগোনা দেখা না যায়।
আমাদের বাপ-বেটার কাজ শেষ হতেই সে সিডমিক্সের বালতিতে একমুঠো নিমপাতা আর বেশ কয়েকটা শুকনা লাল মরিচ রেখে দিলো। আমাদের বলেছিলো, ভালকরে শুকনা মরিচ আর নিমপাতা মিক্স করে দেন। তাইলে আপনার পাখির খাবারে আর পিপড়া বা পোকায় বাসা বানাইতে পারবেনা। তার কথামতো সেদিন শুকনা মরিচ আর নিমপাতা মিশিয়ে রেখেদিয়েছিলাম।
টিয়াপাখি গুলাকে ছেড়ে দিয়েছিলাম আকাশে আর ককাটেল একটা পালিয়ে গিয়েছিলো আরেকটা মারাপড়েছিল খাচায়! খাবারগুলা বালতিতেই আবদ্ধছিলো!
আজ আবার আমার ময়না, টিয়া ও কবুতরের খাবারের আয়োজন করতে গিয়ে বালতিটা খুলেছি। দেখলাম ভেতরের সিডমিক্স গুলা একটু নেতিয়ে গেছে! ভেবেছিলাম সবগুলা নস্ট হয়েগেছে কিন্তু একটু নাড়াচাড়া করতে গিয়ে দেখলাম দুই, আড়াই বছরে একটু ড্যাম্প হয়েছে কিন্তু পিপড়া বা পোকামাকড় এর নামগন্ধ ও নাই। একটু রোদে শুকিয়ে নিলেই আবার ঝকঝকে রুপ ফিরবে সিডগুলার!
কি জীবন নিয়ে এত ব্যস্ততা আমাদের।
এত বাহাদুরি, এত অহংকার!
এত লোভ, এত খাইখাই!
একমুঠো পাতা আর দুইটা শুকনা মরিচ সিডমিক্স কে রেখে দিয়েছে অক্ষত এই দুই তিন বছর।
অথচ যে মানুষটা সিডের অক্ষত রাখার রেসিপি দিয়েছিলো, যে পোকামাকড় আর পিপড়া দুই চোখে দেখতে পারতোনা, সেই মানুষটাই আজ পিপড়া কিংবা পোকার খাবার হয়ে মাটির সাথে মিশে গেছে!
এই জীবন নিয়েই আমাদের এত বাহাদুরি!!!!
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন