সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

যে কাথাটার সেলাই বাকি

২০১৫ সালের এই সময়টাতে, আহিয়ানের জন্মের ৪/৫ মাস আগে, একদিন সন্ধার পর বাসায় ফিরতেই বউ বল্লো,

আর কিছুদিন বাদে আমাদের ঘরে একটা মেহমান আসবে, তাকে কোলে নিবেন কি দিয়ে?

আমাদের তখন নতুন সংসার, আবার আমরা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন। অন্যান্নদের বেলায় হয়ত পরিবারের লোকেরাই সেলাই করে দেয়, বাচ্চাদের ছোট কাথা!

আমাদের বেলায় কি হবে? 

বউ অনেক চিন্তিত!

আমি বললাম, এত ভাবনার কি আছে? দোকান থেকে কিনে নিবো! সে বল্লো, সব কিছু কি কিনতে পাওয়া যায়? 

আমি বললাম, কি করা তাইলে? তুমি বলো! 

সে জানালো, আমাদের যেহেতু কেউ দেবার নাই,তাইলে আমরা ই সেলাই করে নেই!

আমি সেই দিনগুলাতে চেস্টা করতাম বউকে নানা কাজে ব্যস্ত রাখতে, যাতে তার মন খারাপ না থাকে। কান্দিরপার থেকে ৩ টা নতুন কাপড় এনে, ধোয়ে, ইস্ত্রি করে ছোট কাথা বানানোর পালা শুরু করলাম দুইজনে মিলে। আমি সন্ধায় ৭.৩০/৮ টায় বাসায় এসে ফ্রেশ হয়ে চা নাশতা খেয়ে শুরু করতাম কাথা সেলাই করার কাজ। মাপ মতো কেটে, চারপাশে মুড়ি সেলাই করে, কাথার ডিজাইন একে, দুইজনে সেলাই করতাম। আমি খুব একটা না পারলেও তার সঙ্গ দিতাম, অনেক রাত অবধি দুইজনে গল্প করতাম, চা খেতাম, আমাদের ভবিষ্যতের প্লান করতাম, কি ভাবে কি করবো, কি করলে কি হবে। সাথে চলতো কাথা সেলাই।

এখন চিন্তা করি, কতটা পালটে ফেলেছিলাম আমি নিজেকে সেই দিনগুলাতে! কলেজ ভার্সিটি লাইফে সকাল ১০টায় ঘুম থেকে উঠে মাঝ রাত অবধি আড্ডাবাজি, সিগারেট খাওয়া, কার্ড খেলা, ছবি দেখা এমনকোন কাজ নাই যে করিনি। আমাদের সাথে মেয়েদের তেমন একটা বন্ধুত্ব হতোনা, কারন আমরা, মানে আমি, সোহাগ, মিশন- আমরা যারা একসাথে চলতাম, সবাই আমাদের একটু বাকা চোখেই দেখত। আমরা ঠিকমত কলেজে ক্লাস করিনা, প্রাইভেট পড়িনা, গ্রুপ স্টাডি করিনা, সারাক্ষন আড্ডাবাজি, চা-সিগারেট, সকাল,সন্ধ্যা রাত সব খানেই আমাদের দুর্বার উপস্থিতি ছিল। আমাকে বেশিরভাগ লোক ক্যাডার মনে করত, বখে যাওয়া ছেলে। মেয়েদের সাথে চলা ছেলেরাও আমাদের গ্রুপে জায়গা পেতনা। যদিও কলেজ লাইফের শেষে নিজের নামের পাশে অনার্স ও মাস্টার্স দুইটাতেই প্রথম শ্রেনীসহ পজিশান ও নিতে পেরেছিলাম।

শুধু মাত্র ভালবাসার জন্য আমি নিজেকে আমুল বদলে ফেলেছিলাম। বউ যে বিশ্বাস আর ভালবাসা নিয়ে আমার কাছে এসেছিলো তার প্রতিদান তাকে না দিয়ে আমার উপায় ও ছিলনা। আমি চেয়েছি,সে যেন এইটা কোনদিন না ভাবে যে আমার কাছে চলে আসা তার ভুল ছিল। আমাদের সিদ্ধান্ত ভুল ছিল। আমি মনে করি সিদ্ধান্তে ভুল বলে কিছু নাই, সিদ্ধান্তকে সঠিক করে নিতে হয়। আমরা চেস্টা করে গেছি আমাদের সিদ্ধান্তকে সঠিক প্রমানে। হয়ত আমরা সফল ও ছিলাম কারন আমাদের কোনদিনই মনে হয়নি আমরা ভাল নেই!

এবার, বউ কনসিভ করার কয়েক মাস যেতেই আবার একই চিন্তা, এবার কি হবে? বাবুর কাথা কিভাবে কি করবো? আহিয়ানের কিছু কাথা ভাল ছিল, কিন্তু পর্যাপ্ত ছিলনা। বউকে বললাম, কারো আশা না করে চলো এবারো সেলাই করে ফেলি! যেই কথা সেই কাজ, আবারো দুইজনে শুরু করেদিলাম কাথা সেলাই। কিন্তু এবার আর বউ আগের মত করতে পারেনি? ডাক্তার যেহেতু তাকে বেড রেস্ট দিয়েছিল তাই কাথার কাপড় কাটা, মুড়ি সেলাই, ডিজাইন এইসবের জন্য সে আমার উপর নির্ভর করতো বেশি। আমি বউয়ের ডিরেকশান অনুযায়ি কাজ করে দিতাম। কিন্তু সেই-ই সেলাই করত বেশিরভাগ সময়, আমার অত ধৈর্য হতোনা কিন্তু যে কাজগুলা উপোর হয়ে করা লাগে সেগুলা আমিই করে দিতাম। 

এবারে ও দুজনের রাত জেগে কাথা সেলাই, চা খাওয়া, টিভি দেখা, গল্প করা সব চলছিল ভালই। ঈদের কয়েকদিন আগে ডাক্তারের পরামর্শ মত গিয়েছিলাম রক্ত দিতে। আমি ২০০৩ সাল থেকে নিয়মিত রক্ত দেই তাই দেখলাম বউয়ের রক্ত দেবার বেলায় ডোনারের অভাব নেই। প্রথম দিন ভালো ভালোয় রক্ত দেওয়া শেষ হয়, দ্বিতীয় দিনে ও সব স্বাভাবিক ছিল, শুক্রবার,আখেরি জুম্মা বলে সে আমাকে বাসায় পাঠিয়ে দেয়। গোসল করে জুম্মা পড়ে তার সাথে কথা হয়েছিল ফোনে, সে বলেছিল, সে খেয়ে নিয়েছে। একটু রেস্ট নিয়ে রক্ত দেয়া শুরু করবে, আমি যেন একটু ঘুমিয়ে নেই। ২ টায় শেষ কথা হয়, সে ৫ টার দিকে বাসায় চলে আসবে, ইফতারি বানাবে নিজ হাতে, সন্ধার পর ঈদের বাজারের লিস্ট করবে, এবারের ঈদে আর আমাদের গ্রামে যাওয়া হবেনা, তাই ঈদের বাজার সদাইয়ের লিস্ট দিবে সে! আর রাতের খাবারের পর কাথা সেলাই করবে! বেশ কয়েকটা কাথা সেলাই করার এখনো বাকী!

এই কাথাটা সেলাই করা প্রায় শেষ করে এনেছিল। কাথাটা এখনো আছে, সুই সুতা আর গোল ফ্রেমের সাথে! শুধু সেলাই করার সেই হাত দুটি আর নেই।

চলে গেছে একেবারে!

ছোট্ট বাবুটারে সাথে নিয়ে, বহুদুরে,

কোন এক অজানায়!

আমাকে বাকিটা কাথা সেলাই করার ভার দিয়ে!!!

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

A perfect weekend

আব্বা বলতেন ,  A perfect holiday starts with gardening, continues with prayer and ends with a deep sleep.  আমার ছোট বেলায় আব্বা যখন  Narinda Govt. High School   এর শিক্ষক , তখন শুধুমাত্র শুক্রবার ছুটি পেতেন  আর আমি আব্বাকে সপ্তাহে ওই একদিন কাছে পেতাম । পুরো সপ্তাহ আমি আব্বার এই একটা দিনের জন্য অপেক্ষায় থাকতাম । যদিও আব্বা বৃহ:স্পতিবারে আসতেন ঢাকা থেকে বিকেলের মধ্যে । আমাদের স্কুল হাফ থাকত তাই স্কুল থেকে বাড়িতে এসেই আব্বার অপেক্ষা । শুক্রবার সকালে আব্বা নিয়ে যেতেন দাদা-দাদির কবর জিয়ারতে । সেখান থেকে বাড়িতে এসে বাগান বাড়িতে শাকসবজি আর ফল ফুলের গাছের পরিচর্যা করতাম । এই পরিচর্যার ফাকে আম্মা চা বিস্কিট আর শরবত খাওয়াতেন । দুপুরে একসাথে পুকুরে গোসল করে জুম্মার নামাজ শেষে একসাথে খেয়ে আব্বাকে জড়িয়ে ধরে ঘুম । আহা সেকি ঘুম বাবার বুকের মাঝে!! বিকেলে খেলাধুলা করে এসে সন্ধায় আব্বার সামনে পড়তে বসা । অন্য সবাই আব্বার সামনে পড়তে বসতে ভয় পেত কিন্তু আমি আব্বার কাছে পড়তাম । খুব মেজাজি ছিলেন কিন্তু আমার জন্য আব্বার আলাদা একটা টান ছিল সবসময় । সেটা আম্মা মারা যাবার পর খুব বেশি উপলব...

আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে:

মঙ্গলকাব্যের এই একটা উপাধ্যায় আমার মনে খুব রেখাপাত করেছে । আমার সন্তান যেন থাকে দুধেভাতে! প্রত্যেকটা পিতামাতার কাছেই তার সন্তান তার পরম সাধনার ধন । পিতার স্বপ্নের ফল ও ফসল । একজন পিতা কাদামাটিতে যে বীজ বুনে যায় , একজন সন্তান সেই বীজ থেকে চারা গজিয়ে দিনে দিনে তাকে মহীরুহ করে গড়ে তুলে । পিতা বেচে থাকেন আর না থাকেন , সন্তান তার পিতার স্বপ্নের জালে পালতুলে নতুন স্বপ্নের বীজ বুনে যায় পরবর্তি সন্তানের জন্যে । আর এভাবেই যুগযুগ ধরে স্বপ্নেরা বেচে থাকে , ভুমিতলে । পৃথিবীর আবাদি এভাবেই বেড়ে চলে!                    আমি আজন্ম ঘুমকাতুরে লোক । সেই ছোটবেলা থেকে সংসার জীবনের আগ পর্যন্ত আমার ঘুমের এমন অবস্থা ছিল যে একবার ঘুমিয়ে যাবার পর আমার সামনে কেহ ঢোল পিটালেও আমার ঘুমের কোন গত্যান্তর হতোনা । আমি ঘুমের কোলেই থাকতাম । আবার এমনও ছিল , নিজে থেকে জেগে উঠার আগে কেহ আমাকে ঘুম থেকে জাগালেই আমার মাথা ব্যাথা হতো খুব । একারনে সাধারনত কেহ মানে পরিচিতজনদের মাঝে কেহ আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলতোনা । আমি আমার মত করে ...

আমি যদি কাক হতাম

                   ২২ মে । আর সকল দিনের মতোই ছিল সবার জন্য । শুধু আমার আর আহিয়ানের জন্য কিছুটা ব্যতিক্রম ছিল । গতকাল ছিল তার (প্রয়াত বউয়ের) চলে যাবার ১ম বার্ষিকী । ২০২০ সালের ২২ মে , জুম্মাতুল বিদার দিনে বিকেল ৩.১৫ মিনিটের সময় সে চলে গেছে আমাদের ছেড়ে , ছোট্ট বাবুটাকে সাথে নিয়ে । এই এক বছরে অনেক কিছু বদলেছে ,      সাথে বদলেছি আমি আর নিজেকে বদলে নিয়েছে আহিয়ান । গতকাল দিনটাকে আর দশটা দিনের মতোই স্বাভাবিকভাবে কাটানোর চেস্টা করেছি । কতকটা পেরেছি আবার কতকটা পারিনি । শুধু একবার আফসোস করে ভেবেছি , " আমি যদি কাক হতাম!"   নজরুল আমার প্রিয় কবি । ছোটবেলা থেকেই । দু:খ কস্টে , দারিদ্রে , শ্রমে ঘামে , আত্মমর্যাদায় , অভিমানে বেচে থাকা নজরুল আমার খুব প্রিয় , খুবই শ্রদ্ধার । নজরুলের একটা গান/গজল ছোট বেলা থেকে খুব পছন্দ করতাম , গুনগুন করে গাইতাম । সেটা ছিল- আমি যদি আরব হতাম , মদিনার ও পথ সেই পথেতে হেটে যেতেন ,  নুর নবী হযরত (স) । কাল মনে হচ্ছিল , আমি যদি কাক হতাম!         ...