সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

অপেক্ষার চোখ ফ্রেশরুমের দরজায়

      শ্যামল ফ্রেশরুমের দরজার দিকে অপলক তাকিয়ে আছে, কারো অপেক্ষায় আছে সে! পাশাপাশি দুইটা দরজা। একটার উপর পুরুষবাচক চিহ্ন। শ্যামল যেই দরজায় একদৃস্টে চেয়ে আছে সেটার উপর নারী সুচক চিহ্ন! শ্যামলের চেয়ে থাকাটা বেশ দৃষ্টিকটু লাগছে পাশের টেবিলে বসা দম্পতির। বেয়ারাকে ডেকে সেই ইংগিত ও দিয়েছে তারা কিন্তু শ্যামলের কোন হুশ নাই! সে তারমতো করে তাকিয়েই আছে! 

অর্ডার করা খাবার মানে থাই স্যুপ, ফ্রেঞ্চফ্রাই আর ক্যাশনাট স্যালাড সার্ভ করে গেছে প্রায় ৪০/৪৫ মিনিট আগেই! একেলা সে অনেকদিন পর রেস্টুরেন্টে খেতে বসেছে। ওয়েটার ডেকে দেয়াতে হুশ ফিরে পায় শ্যামল আর খেতে আরম্ভ করে। একচামচ ক্যাশনাট স্যালাড মুখে পুড়েছিল সে, মনে পড়ে গেল অতীত দিনের অনেক স্মৃতি!

সৃস্টি বাইরে খেতে পছন্দ করতো খুউব। সপ্তাহে ২/৩ বার বাইরে খেতেই হতো। বেশিরভাগ সময়ে রাতের ডিনার এ, সৃস্টি বলতো, চলেন আজকে বাইরে খাই! একেবারে ছেলে মানুষী আবদার তাও ভর দুপুরে শ্যামল অফিসে থাকাকালীন।  সন্ধার পর বাসায় ফিরতে না ফিরতেই সৃস্টি বলতো, ফ্রেশ হয়ে যান তারাতারি। আমি কিন্তু রেডি। একএকদিনে একএকটা রেস্টুরেন্টে যাওয়া হতো। খাবারের ম্যানু সৃস্টিই ঠিক করতো কারন শ্যামলের পছন্দ বলতে নানরুটি আর কাবাব! একই খাবার বারেবার খেতে কার ভাললাগে? সৃস্টি খাবারের অর্ডার দিয়েই চলে যেত ফ্রেশ হতে!

রেস্টুরেন্টে খেতে পছন্দ করলেও সৃস্টির খুবই বিরক্তি লাগতো খাবারের জন্য বসে থাকা। তাই খাবার অর্ডার করেই সে চলে যেত ফ্রেশ হতে। খাবার সার্ভ করতে অন্তত আধাঘন্টা সময় লাগে, সৃস্টি এই আধাঘন্টা সময় পার করে আসে ফ্রেশ হতে হতে। কপালের টিপটা পড়ে নেয়, শাড়ীর আচলটা ঠিক করে, লিপস্টিক টা খুব গাড় করে দিয়ে লাইনার এর ব্যারিকেডের মাঝে গুছিয়ে নেয়। শ্যামল তাই অপেক্ষায় তাকিয়ে থাকে সৃস্টির না আসা পর্যন্ত। বাসা থেকে বের হয়ে আসা সৃস্টি আর ফ্রেশরুম থেকে বেরিয়ে আসা যেন দুইজন। অপলক তাকিয়ে থেকে শ্যামল সৃস্টির বের হয়ে আসা দেখে সবসময়ে। খুব আরাধ্য একটা সময় শ্যামলের জন্যে।

পাশের টেবিলের লোকেদের ভ্রু কুচকে দেখা, বেয়ারার ধাক্কা দিয়ে হুশ ফেরানো, ঠান্ডা হতে যাওয়া স্যুপ কোন কিছুই আজ শ্যামলের দৃস্টি ফেরাতে পারেনি। শ্যামল বরাবরের মতই অপেক্ষায়, অধীর অপেক্ষায় সৃষ্টির রাজসিক ফেরার! কপালের টিপখানা, শাড়ির আচল আর ঠোটের লাল লিপস্টিক, সব কিছুর সংমিশ্রনে ফিরবে সৃস্টি একটা ঐশরীক আভা নিয়ে! শ্যামলের অপেক্ষার শেষ হয়না, চোখ দুইটাও ফ্রেশরুম এর দরজা থেকে সরে আসেনা!

হুশফিরে পেয়ে ক্যাশনাট সালাদ মুখে দিতেই ক'ফোটা চোখের জল গড়িয়ে পড়েছে স্যুপের পেয়ালায়! অধির অপেক্ষায় থাকা শ্যামল যেন সম্বিত ফিরে পেয়েছে! বুঝতে পেরেছে সৃস্টি চলে গেছে ওপারে আজ বহুদিন! কপালের লাল টিপ নিয়ে সে আর ফিরবেনা রেস্টুরেন্টের ফ্রেশরুম থেকে!!!

বলো শ্যামল কোথায় তোমার সাধের পেয়ারী!!!!!

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

A perfect weekend

আব্বা বলতেন ,  A perfect holiday starts with gardening, continues with prayer and ends with a deep sleep.  আমার ছোট বেলায় আব্বা যখন  Narinda Govt. High School   এর শিক্ষক , তখন শুধুমাত্র শুক্রবার ছুটি পেতেন  আর আমি আব্বাকে সপ্তাহে ওই একদিন কাছে পেতাম । পুরো সপ্তাহ আমি আব্বার এই একটা দিনের জন্য অপেক্ষায় থাকতাম । যদিও আব্বা বৃহ:স্পতিবারে আসতেন ঢাকা থেকে বিকেলের মধ্যে । আমাদের স্কুল হাফ থাকত তাই স্কুল থেকে বাড়িতে এসেই আব্বার অপেক্ষা । শুক্রবার সকালে আব্বা নিয়ে যেতেন দাদা-দাদির কবর জিয়ারতে । সেখান থেকে বাড়িতে এসে বাগান বাড়িতে শাকসবজি আর ফল ফুলের গাছের পরিচর্যা করতাম । এই পরিচর্যার ফাকে আম্মা চা বিস্কিট আর শরবত খাওয়াতেন । দুপুরে একসাথে পুকুরে গোসল করে জুম্মার নামাজ শেষে একসাথে খেয়ে আব্বাকে জড়িয়ে ধরে ঘুম । আহা সেকি ঘুম বাবার বুকের মাঝে!! বিকেলে খেলাধুলা করে এসে সন্ধায় আব্বার সামনে পড়তে বসা । অন্য সবাই আব্বার সামনে পড়তে বসতে ভয় পেত কিন্তু আমি আব্বার কাছে পড়তাম । খুব মেজাজি ছিলেন কিন্তু আমার জন্য আব্বার আলাদা একটা টান ছিল সবসময় । সেটা আম্মা মারা যাবার পর খুব বেশি উপলব...

আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে:

মঙ্গলকাব্যের এই একটা উপাধ্যায় আমার মনে খুব রেখাপাত করেছে । আমার সন্তান যেন থাকে দুধেভাতে! প্রত্যেকটা পিতামাতার কাছেই তার সন্তান তার পরম সাধনার ধন । পিতার স্বপ্নের ফল ও ফসল । একজন পিতা কাদামাটিতে যে বীজ বুনে যায় , একজন সন্তান সেই বীজ থেকে চারা গজিয়ে দিনে দিনে তাকে মহীরুহ করে গড়ে তুলে । পিতা বেচে থাকেন আর না থাকেন , সন্তান তার পিতার স্বপ্নের জালে পালতুলে নতুন স্বপ্নের বীজ বুনে যায় পরবর্তি সন্তানের জন্যে । আর এভাবেই যুগযুগ ধরে স্বপ্নেরা বেচে থাকে , ভুমিতলে । পৃথিবীর আবাদি এভাবেই বেড়ে চলে!                    আমি আজন্ম ঘুমকাতুরে লোক । সেই ছোটবেলা থেকে সংসার জীবনের আগ পর্যন্ত আমার ঘুমের এমন অবস্থা ছিল যে একবার ঘুমিয়ে যাবার পর আমার সামনে কেহ ঢোল পিটালেও আমার ঘুমের কোন গত্যান্তর হতোনা । আমি ঘুমের কোলেই থাকতাম । আবার এমনও ছিল , নিজে থেকে জেগে উঠার আগে কেহ আমাকে ঘুম থেকে জাগালেই আমার মাথা ব্যাথা হতো খুব । একারনে সাধারনত কেহ মানে পরিচিতজনদের মাঝে কেহ আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলতোনা । আমি আমার মত করে ...

আমি যদি কাক হতাম

                   ২২ মে । আর সকল দিনের মতোই ছিল সবার জন্য । শুধু আমার আর আহিয়ানের জন্য কিছুটা ব্যতিক্রম ছিল । গতকাল ছিল তার (প্রয়াত বউয়ের) চলে যাবার ১ম বার্ষিকী । ২০২০ সালের ২২ মে , জুম্মাতুল বিদার দিনে বিকেল ৩.১৫ মিনিটের সময় সে চলে গেছে আমাদের ছেড়ে , ছোট্ট বাবুটাকে সাথে নিয়ে । এই এক বছরে অনেক কিছু বদলেছে ,      সাথে বদলেছি আমি আর নিজেকে বদলে নিয়েছে আহিয়ান । গতকাল দিনটাকে আর দশটা দিনের মতোই স্বাভাবিকভাবে কাটানোর চেস্টা করেছি । কতকটা পেরেছি আবার কতকটা পারিনি । শুধু একবার আফসোস করে ভেবেছি , " আমি যদি কাক হতাম!"   নজরুল আমার প্রিয় কবি । ছোটবেলা থেকেই । দু:খ কস্টে , দারিদ্রে , শ্রমে ঘামে , আত্মমর্যাদায় , অভিমানে বেচে থাকা নজরুল আমার খুব প্রিয় , খুবই শ্রদ্ধার । নজরুলের একটা গান/গজল ছোট বেলা থেকে খুব পছন্দ করতাম , গুনগুন করে গাইতাম । সেটা ছিল- আমি যদি আরব হতাম , মদিনার ও পথ সেই পথেতে হেটে যেতেন ,  নুর নবী হযরত (স) । কাল মনে হচ্ছিল , আমি যদি কাক হতাম!         ...