আমাদের সংসার টা শুরু হয় ২০১৫ সালে। আমাদের দুই ফ্যামিলির কেহ রাজি ছিলোনা। যদিও আমরা ২০১৩ সালের ১ মে বিয়ে করি কাজি অফিসে। এই দুই বছর অনেক প্রচেষ্টা ছিল আমাদের দুই পরিবার কে রাজি করাতে কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়নি। হাউজিং এস্টেট বাসা ভাড়া নেই। গোলমার্কেট এর পিছনে। তার আগের কয়েকটা দিন বন্ধু MD Liton MD Liton এর বাসায় আছ্রিত ছিলাম। বাসা নেয়ার পর বাসা সাজানোর চিন্তা মাথায় আসে। আমাদের যে কিছুই নাই। লিটনের বাসায় বসে সে কাগজ কলম নিয়ে বসে কি কি লাগবে তার একটা লিস্ট করে! বউ তার সংসার সাজাবে!
অনেক বড় লিস্ট লেখা হয়। ঘটি বাটি,দা, চাদর বিছানা, হাড়ি পাতিল সব। আমরা ঠিক করলাম রাজগঞ্জ থেকে কেনা কাটা শুরু করবো। আমাদের কেনাকাটার সাথি বাল্যবন্ধু সুমন সালাহউদ্দিন। একটা অটোতে করে আমরা রাজগঞ্জ পৌচ্ছাই। প্রথমে একটা ক্রোকারিজ এর দোকানে গেলাম। যেখানে একসাথে অনেক কিছুই পাবো। বউ দামাদামি করা পছন্দ করতোনা। তাই ফিক্সড প্রাইস এর দোকানে গেলাম। তিনজনে মানে আমি, বউ আর সুমন লিস্টের কপি মোবাইলে ছবি তোলে নিয়ে কেনাকাটা শুরু করি। আমি সবার প্রথম এই ছোট ডেকচি টা হাতে নেই।
আমি দেখলাম বউ মিটমিট করে হাসছে। আমি আর সুমন তার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, কি হইছে? হাসো কেন? সে হাসি থামিয়ে দিয়ে বললো,আমার জামাই তার চায়ের ডেকচি দিয়ে সংসার শুরু করেছে। আমি আনমনেই ডেকচিটা হাতে নিয়েছিলাম। বউয়ের কথা শুনে উপস্থিত সবাই একসাথে হেসে উঠে! আমাদের সংসার শুরু চায়ের পাতিলে!
এই পাতিলটা এখনো ঝকঝকে আছে। এইটুকুন ও কালি লাগতে দেয়নি বউ। সে খুব পরিপাটি ছিল। ঠিক আমার ব্যতিক্রম। আমি মেস লাইফে বড় হয়েছি। পড়াশুনা শেষে যখন ব্যাংকের চাকরি শুরুকরি সেই ২০১১ সালে তখনো মেস লাইফ ই ছিলো ভরসা। গোছানো চলা কোন কালেই আমার হয়ে ওঠেনি। ছোট বেলায় সব বোনেরা মিলে আমার কাপড় ধোয়ে দিত, পড়ার টেবিল গুছিয়ে দিত, গোসল করিয়ে দিত। যেহেতু আমার বড় ৭ বোন আর ২ ভাই ছিল,তাই আমাকে কোনদিন কোনকিছু গোছাতে হয়নি।
সংসার শুরুর পর থেকে এই পরিস্কার থাকা আর সব পরিস্কার রাখা নিয়ে একটা ছোটখাটো যুদ্ধ চলতো বউয়ের সাথে। চা আমার অসম্ভব পছন্দ। যেকোন চা-ই আমার চলে। বউ হিসেব করে দিনে ৩ কাপ চা খেত। সকাল সন্ধ্যা আর রাতে খারারের পর। মার্কস দুধের চা,গারো লিকার আর সামান্য চিনি। স্বচ্ছ কাচের গ্লাসে চা খেত সে। বলতো, চায়ের আসল মজা চায়ের রঙ এ, স্বচ্ছ কাচের গ্লাসে চায়ের রঙ ফুটে থাকত। এইটা তার পছন্দ ছিল। বউয়ের সাথে ৩ কাপ ছাড়াও আমার অন্তত আরো ৭/৮ কাপ চা দিনে লাগত। কখনো রঙ চা আবার কখনো দুধ চা। বাসায় থাকা কালীন প্রায় একদেড় ঘন্টা পরপরই চা খেতাম। মাঝে মাঝে বউ বিরক্ত হত কিন্তু আবার চা বানিয়ে দিয়ে বলত, এই নেন,আপনার চা। কি মানুষ আপনি,শুধু চা খান।
ঢাকার চাকরি কালিন সময়ের কথা, ইদের ১ দিন পরই ব্যাংক খুলে যায়। তাই ইদের পরে বাসায় শুধুমাত্র আমি একা, বাকি কারো ইদের ছুটি শেষ হতনা। বাসায় একা আর ইদের সময় কাজের বুয়ারা লম্বা ছুটিতে যেত তাই, ইদের পরের ৪/৫ দিন আমাকে শুধু চা আর পাউরুটি সম্বল করে বাচতে হত। যদিও ইদের পর পাউরুটি ও পাওয়া যেতনা। তাই এমন হয়েছে অনেক যে শুধুমাত্র চা আর বিস্কুট খেয়ে ৩/৪ দিন পার করে দিয়েছি। বউ জিজ্ঞাসা করত, কি খাইছেন? বলতাম,খাইছি, রান্না করেছি। সে বুঝে যেত, বলত, চা রান্না করেছন, তাই না? আমি কোনদিন বউয়ের সাথে মিথ্যা বলতাম না। সে কাঁদত! ইদের পরে বুঝি মানুষ চা বিস্কুট খায়? আমি বলতাম,পাগলি, তুমি জাননা, আমার সবচেয়ে পছন্দের খাবার হলো চা!!!
বউ আমাকে ছেড়ে গেছে আজ ১৩ দিন! আহিয়ান আছে তার নানা নানির কাছে,ধর্মপুর। আমি এখনো অফিসে যাইনি। সামনের সপ্তাহ থেকে যাবো। প্রায় প্রতিদিন তালপুকুর পাড় আমার বউয়ের সংসার দেখতে আসি। বাসায় এলেই প্রথমেই চোখ যায় এই চায়ের পাতিলটার উপর। এই পাতিলটা এখনো চকচকেই আছে। সবই আছে আগের মত।নিখুত, ঝকঝকে, শুধু আমার বউ নাই। আছে আর বাকী সব!
কি জীবন আমাদের? সামান্য একটা চায়ের পাতিলও থাকে ঝকঝকে, নিখুত! শুধু থাকেনা আমাদের প্রিয় মুখ, প্রিয় মানুষ। এইত জীবন।
আহা, সংসার!
আহা! জীবন!
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন